অবশেষে

রতন তার বন্ধুদের সাথে নদীর তীরে খেলছিলো। বালক বয়সে পড়ালেখার কথা কে শোনে। খেলাধুলা, আর ঘুরে বেড়ানোই তো পৃথিবীর আনন্দময় বিষয়গুলোর একটি। হঠাৎ মেঘের গর্জন। সবাই গরু- মহিষ মাঠ থেকে ঘরে ফেরাচ্ছে, রোদে শুকাতে দেওয়া ধান তুলছে। বৃষ্টি যেন আগাম বার্তা না দিয়েই চলে আসলো।

হারান মাঝি ও নৌকা ভিড়িয়েছে ঘাটে। আর মানুষ নিয়ে ওই পারে যাবেনা। বর্ষা আসলেই নদীর জল যায় বেড়ে। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে । আকাশ যেন মেঘের গর্জনের সাথে ভেঙে পড়ছে। বালকরা বৃষ্টিতে ভিজছে। কিন্তু রতনের ভেজা হলো না।ঠান্ডা লাগলে বাবা খুব বকবে। তাড়াহুড়ো করে বাড়ি যাচ্ছিলো সে।মাঝপথে মনু বললো কিরে রতন বাড়ি যাচ্ছিস? হ্যাঁ গো দাদা,বৃষ্টিতে ভিজলে বাবা আর আস্ত রাখবেনা। শুনলাম তোদের ঘরে নতুন অতিথি আসছে !! রতন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে দৌড়ে চললো। বাড়ি গিয়ে দেখে বাবা,ঠাকুমা, পিসি ঘরের বারান্দায় বসে আছে,আর প্রতীক্ষা করছে। বাবার মুখের দিকে একবার চেয়ে রতন ঠাকুমার কাছে গেল। পিসি গামছা এনে গা মুছে দিলো।

হঠাৎ ই ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ। বিনির মা ঘর থেকে বেরিয়ে বললো ঘরে যেন চাঁদ এসেছে গো! মেয়ে হয়েছে কুসুমের।  সবাই অনেক খুশি, বাবা একটু  বেশিই খুশি। রতনের জন্মের আগে তার যে বোন হয়েছিলো সে জন্মের এক বছরের মাথায় মারা গিয়েছিলো। কুসুম মেয়েকে খাটে রেখে গেছে রান্নাঘরে, ঠাকুমা ছিলো না ঘরে,পিসি গেছিলো স্নানে, মেয়েটা খাট থেকে পড়ে মরেই গেলো। অনেক কষ্ট পেয়েছিলো মাধব বাবু। তাই তার মেয়ের বড় শখ ছিলো। 

ঠাকুমা,  পিসি  ঘরে ডুকলো, মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করছে, আর বলছে কুসুম,দ্যাখ, কী সুন্দর মেয়ে এনেছিস ধরায়। পিসিও বলছে দেখো না বৌদি মেয়ে আমাদের পূর্ণিমার চাঁদ। কিন্তু কুসুম কথা তো বলেই নি, চোখ মেলে তাকায় ও নি।

রতন আর কখনোই তার মায়ের হাতের পায়েসও খেতে পারেনি।

মাধব বাবু মেয়ের নাম রাখলেন পান্না। ধীরে ধীরে পান্না বড় হতে লাগলো, পান্নার যখন ৫ বছর বয়স রতন তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। ছেলে- মেয়ে কে নিয়েই মাধব বাবুর দিন কাটে। পাশের গ্রাম কাজলপুর,সেখানের একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অংকের শিক্ষক মাধব নারায়ণ বসাক। বাচ্চাদের প্রিয় শিক্ষক তিনি।

ঠাকুমার ও বয়স হয়েছে,কত রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। একদিন শ্বাসকষ্ট শুরু হলো।  বাড়ির কাছে কোন হাসপাতাল নেই,ডাক্তার তো নেই ই। মাধব বাবু ছিলেন স্কুলে। তাঁকে খবর দেওয়ার আগেই ঠাকুমার নিঃশ্বাস পড়ে গেলো।

পিসিকে বিয়ে দিয়েছে দুইগ্রাম পরে বাড়ি মানিক বনিকের ছেলের সাথে। ছেলে পেশায় উকিল। আয় রোজগার ও বেশি না, সবসময় কাজ থাকেও না।

একাই মাধব বাবু ছেলে মেয়েকে মানুষ করতে লাগলেন।হয়তো মাধব বাবু বিয়ে করতে পারতেন আরেকটা। কিন্তু তিনি তা করেননি। কুসুমকে বড্ড বেশি ভালোবাসতেন তিনি।  পান্নাকেও স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন।

গ্রামের নদীটার নাম ভদ্রা নদী। বেশি বড় না,ছোটও না। নদী পার হলেই ভারত। রোজই মানুষ নদী দিয়ে এপার, ওপার যাওয়া আসা করে। ব্যবসার কাজে, হাট বাজার, কারো বা বাপের বাড়ি নদীর এপার,শ্বশুর বাড়ি ওপার।

মাধব বাবু ঠিক করলেন রতনকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেবেন। সেখানে রতনের মায়ের দূর সম্পর্কের ভাই থাকে। রতনের সেই মামার কাছে থেকেই পড়াশোনা চলতে লাগলো তার। মাধব বাবুর ও বয়স হচ্ছিলো। অনেক বয়স করে বিয়ে করেছিলেন,প্রায় ৩৭ বছরে। ছেলে মেয়ে বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ও বয়স বাড়ছিলো। 

রতনের মন টেকে না মামা বাড়ি, কিন্তু বাবার কথা রক্ষার্থে তাকে সব চুপচাপ সইতে হয়। মামি রতনকে পছন্দ করতো না। ঠিক মতো খেতেও দিতো না। কিন্তু রতন কিছুই বলতো না, থাকে পরের ঘরে, কিছু বলা মানায় না। 

মামি রতন কে দিয়ে রান্না ছাড়া সব কাজই করাতো ঘরের। পড়ার সময় ও কাজের ফরমায়েশ।

একদিন রতন তার বাড়িতে গেলো। বোন তো রতন কে দেখে খুবই খুশি। তারা সবাই খুব গল্প করছে।  পান্না জিজ্ঞেস করছে দাদা কোলকাতা কেমন রে?অনেক বড় তাই না!?  রতন আজ নিজে রান্না করবে,  ১৭ বছর বয়স অনেক বড় হয়ে গেছে রতন। সে আজ ট্যাংরা মাছের ঝোল রেধেঁছে। পান্না ভালো বাসে এই মাছ। খাওয়া শেষে রতন পান্নাকে একটা শাড়ি দেখালো, বললো তোর জন্য আনলাম, কেমন লাগলো বল। পান্না বলে,দাদা, আমি শাড়ি পরতে পারি? ছোট যে আমি। আচ্ছা তাহলে এই চুড়ি গুলো দেখ। পান্নার চুড়িগুলো পছন্দ হলো। লাল চুড়ি। পান্নার লাল রং প্রিয়। সে অনেক খুশি।

তিনদিন পর রতনের ফেরার পালা,  মন না চাইলেও ফিরতে হবে। 

দেখতে দেখতে রতন পড়াশোনা শেষ করলো। চাকরি পেয়েছে,সে। 

বাবার মতো সে ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  শিক্ষক।

সে আর মামার বাড়ি থাকবে না। মামির অত্যাচার আর সহ্য করা যায় না। সে দূরে জমি কিনে, ঘর তুলেছে। বড় না খুব,কিন্তু শান্তি আছে।

সে তার বাবা, বোন কে নিয়ে এলো এখানে। বাবার ও চাকরি শেষ। 

বোনকে এখানে এনে পড়ালেখা করাচ্ছে।

পড়ালেখার মাঝেই বাবা মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে রতনের সাথে কথা বললো।

রতন তার স্কুলের একজন স্যারের ছেলের সাথে বিয়ে করলো বোনের। ধুমধামে বোনের বিয়ে দিলো।খুব ভালোবাসতো সে তার বোনকে।

ঘর খালি  হয়ে গেলো।  

কয়েক মাস পর মাধব বাবু রতন কে বলছেন, আমার বয়স হয়েছে কয়দিন বাঁচবো, ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নে না।

রতন বললো বাবা আরো পরে। মাধব বাবু কী আর ছেলের আশায় বসে রইলেন। পাত্রী খুঁজতে লাগলেন।

একদিন রতন একটি বইয়ের দোকানে গেলো কিছুগল্প, উপন্যাসের বই কিনতে। সেই দোকানে অনেকেই ছিলো, একটি মেয়েও ছিলো। রতন বই কিনে বাস স্টপে বসে আছে, বাস এলেই উঠবে। মেয়েটিও বসে আসে তবে সে যাবে পরের বাসে।

যথারীতি বাস আসায় রতন  উঠে পড়লো, স্টপে বই রেখে, মেয়েটি দেখলো রতন বাসে উঠে যাচ্ছে।  কিন্তু নাম না জানায় ডাক দিতে পারলো না

সে বই টি সেই বই দোকানে নিয়ে গেলো, আর দোকানীকে দিয়ে বললো বইটা রাখুন, একজন আসবে হয়তো বইটার জন্য, দোকানী বললো একটা সই করে যান, বইটা যে আপনি রেখেছেন তার প্রমাণ হিসেবে।

সে তার নাম লিখে গেলো, নন্দিনী। পরের দিন রতন এসে বললো কাল হয়তো আমি বই ফেলে গেছি পেয়েছেন, দোকানী বই দেখিয়ে বললো এটা? রতন দেখলো এটা সেই বইটা। সে বইটা নিয়ে দোকানীকে ধন্যবাদ দিলো, দোকানী বললো বইটা নন্দিনী বলে কেউ পেয়ে রেখে গেছে। হঠাৎ নন্দীনির আগমন। দোকানী বললো ইনি পেয়েছে আপনার বই। দুজন দুজনকে প্রথম দেখলো, রতন খুবই কৃতজ্ঞ। সে অনেক ভাবে সেটা প্রকাশ করলো। তারপর কিছুদিন তাদের দেখা হয়নি। ১ মাস পরে দুজনের একটা রাস্তার মোড়ে  দেখা হলো। চিনতে পেরে কথা বললো। এভাবে প্রায়ই দেখা,কথা হতো। জানতে পারে নন্দীনি একটা স্কুলের গানের শিক্ষিকা। 

এভাবে রতনের নন্দীনিকে ভালো লাগলো। সে একদিন সিদ্ধান্ত নিলো ওকে বলবে মনের কথা। নন্দীনিরও ভালো লাগতো। কিন্তু তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। রতন একদিন দেখা করতে চাইলো।  নন্দিনীও চাইলো। রতন বললো একটা কথা বলার ছিলো। নন্দিনী ও বললো। রতন বলে বলুন তবে। নন্দিনী তাকে বিয়ের কথা বললো। আমার আগামী মাসে বিয়ে, আপনি আমার বন্ধু হয়ে গেছেন,তাই ভাবলাম,নিমন্ত্রণ না দেই কী করে! রতনের মন ভেঙে গেলো, সে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু বুঝতে দিলো না। নন্দিনী বললো বলুন আপনার কথা। রতন  বললো থাক,অন্যদিন।

 রতন আর খোঁজ নেয়নি নন্দিনীর। 

বাবা, রতনকে লক্ষ্য করেছে, মুখ ভার। পরে বললো তোর জন্য মেয়ে দেখেছি,ভালো মেয়ে, আগামী মাসে বিয়ে। রতন কিচ্ছু বলেনি। মেনে নিলো। বিয়ের দিন সে ছাদনা তলায় গিয়ে দেখে মেয়েটা নন্দীনির মতো। কিন্তু তার সাহস হচ্ছে না জিজ্ঞেস করতে আপনি কী নন্দিনীর বোন? যদি মেয়েটা কষ্ট পায় এটা ভেবে তার হবু বর অন্য কাউকে পছন্দ করে। শুভদৃষ্টির সময় এলো। ঘোমটা সরিয়ে নন্দিনী বললো কী রতন বাবু আমাকে নন্দীনির মতো লাগছে দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো!!!

লেখক: রিয়া চক্রবর্তী, ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষ

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *