আমার প্রিয় লক্ষ্মীপুর

স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর যখন ব্যাচমেট, বন্ধুদের কাছে নিজেকে লক্ষ্মীপুর জেলার পরিচয় দিতাম, তখন অনেকে লক্ষ্মীপুর জেলাকে চিনতো না। আবার অনেকে বলতো ও আচ্ছা নোয়াখালী জেলা।লক্ষ্মীপুর বললে অনেকে নোয়াখালী মনে করে। খুব মন খারাপ হয়, যখন লক্ষ্মীপুরকে কেউ নোয়াখালী বলে বা লক্ষ্মীপুরকে চিনে না বললে।

আমার এ লক্ষ্মীপুর একটি স্বতন্ত্র জেলা। এ জেলার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, রয়েছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান এবং দেশের কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিরও জন্ম হয়েছে এ জেলায়। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা এ লক্ষ্মীপুর। জেলায়। যারা এখনো লক্ষ্মীপুর সম্পর্কে জানে না, তাদের জানার জন্য আমি আমার এ প্রিয় জন্মস্থান সম্পর্কে কিছু ইতিহাস, এর লক্ষ্মী মানুষ, এ জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কিছু মনের ভাব তুলে ধরছি।

বাংলাদেশের মানচিত্রে ১৯৮৪ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর নামে একটি স্বতন্ত্র জেলার জন্ম হয়। লক্ষ্মী শব্দটি থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার নামকরণ করা হয়।

দালাল বাজারের জমিদার রাজা গৌর কিশোর রায় চৌধুরীর বংশের প্রথম পুরুষের নাম লক্ষ্মী নারায়ন রায় এবং রাজা গৌর কিশোরের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মী প্রিয়া। ঐতিহাসিকগন মনে করেন, লক্ষ্মী নারায়ণ রায় বা লক্ষ্মী প্রিয়ার নামানুসারে লক্ষ্মীপুর নামকরণ করা হয়েছিল। সাড়ে তিনদশক আগে লক্ষ্মীপুর জেলা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে জন্ন হলেও ঐতিহাসিকগন এর ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে ৩০০ বছর আগেকার ইতিহাস খুঁজে পেয়েছেন। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ উদ দৌলার পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের রাজত্ব আদায়ের জন্য প্রাচীন ভুলুয়াকে ১৭৭২ সালে ঢাকার অধীন, ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহের অধীন এবং ১৭৯০ সালে ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসে।

পরে ১৮২৯ সালে ভুলুয়া চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে চলে আসে। ১৮৬৪ সালে এ ভূ-খন্ডের মধ্যবর্তী অঞ্চলে চাষাবাদ ও যোগাযোগের স্বার্থে একটি নতুন খাল খনন করা হয়। ঐ নয়া খালের গুরুত্ব বিবেচনায় ভুলুয়ার নামকরণ নোয়াখালী হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতেও লক্ষ্মীপুর ভুলুয়া রাজ্যের অংশ ছিল। লক্ষ্মীপুর নামে সর্বপ্রথম থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬০ সালে। এরপর ১৯৭৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর তৎকালীন বাঞ্চানগর ইউনিয়ন লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় রূপান্তরিত হয়। পরে এই পৌরসভার বিস্তৃতি ঘটে রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নিয়ে। ১৯৭৯ সালের ১৯শে জুলাই লক্ষ্মীপুর মহকুমা এবং একই এলাকা নিয়ে ১৯৮৪ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় লক্ষ্মীপুর জেলা। পরবর্তীতে রামগতি উপজেলাকে ভাগ করে কমলনগর উপজেলা গঠিত হয়। বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলাটি ৫৮ টি ইউনিয়ন, ৪ টি পৌরসভা, ৫ টি উপজেলা, ৪৭৪ টি মৌজা ও ৫৪৭ টি গ্রাম নিয়ে সর্বমোট ১৪৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্মীপুর নিয়ে কিছু ইতিহাস।

আমাদের লক্ষ্মীপুর জেলা কোন এক সময় নোয়াখালীর অন্তর্গত ছিল কিন্তু ১৯৮৪ সাল থেকে এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা। আমাদের লক্ষ্মীপুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ। রামগতি বাজারের পশ্চিম দিক দিয়ে মেঘনা নদী বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য খুবই মনোরম।

এটি একটি প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। এখানে কুয়াকাটার মতো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। রঙ-বেরঙের পালতোলা নৌকার সারি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। এছাড়াও লক্ষ্মীপুরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, মসজিদ ও মাজার রয়েছে, যেগুলো পর্যটকরা ভ্রমন করতে পারে। লক্ষ্মীপুরের কাঞ্চনপুরে মহান সাধক হযরত মিরান শাহ ( রঃ) এর মাজার, এবং দুইশত বছরের অধিক পুরাতন রামগঞ্জের শ্যামপুর দায়রা শরীফও ধর্মানুরাগী মানুষকে আকর্ষন করে।

দালাল বাজারের কামানখোলা জমিদার বাড়ি একটি দদর্শনীয় স্থান। দুইশত বছরের প্রাচীন রায়পুরের তিতাখাঁ জামে মসজিদ স্থানীয়ভাবে জ্বীনের মসজিদ নামে পরিচিত। একশো পনেরো বছরের প্রাচীন কাঞ্চনপুর জমিদার বাড়ি সৌন্দর্য ও স্থাপত্য শৈলীর জন্য প্রসিদ্ধ। এশিয়ার সর্ব বৃহত্তম মৎস প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় অবস্থিত। এছাড়াও মান্দারী বাজার বড় জামে মসজিদ, নন্দী গ্রামের নাগবাড়ি, খোয়াসাগর দিঘী, রামগতি বুড়াকর্তা মন্দিরের মতো বহু নিদর্শন রয়েছে। ভ্রমন পিয়াসুদের জন্য রয়েছে আলেকজান্ডার মেঘনা বীচ, মতিরহাট বালুচর, মজুচৌধুরী হাট, পৌর শিশুর পার্ক, রামগঞ্জের শ্রীরামপুর রাজবাড়ি, দিঘী নবীনগর, কমলা সুন্দরী দিঘীর মতো অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন স্থান।

কৃষিক্ষেত্রেও লক্ষ্মীপুর সমৃদ্ধ। নারিকেল, সুপারি আর সয়াবিনে ভরপুর আমাদের আবাসভূমি প্রিয় লক্ষ্মীপুর। হ্যাঁ, এ জেলায় প্রচুর পরিমানে নারিকেল, সুপারি ও সয়াবিন উৎপাদিত হয়। দেশের মোট উৎপাদনের ৮৫% সয়াবিন এ জেলায় উৎপাদিত হয়। সেই সুবাদে ২০১৬ সালে জেলার ব্রান্ড হিসেবে সয়াবিনকে চিহ্নিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন। নতুনভাবে লক্ষ্মীপুরকে পরিচিত করা হয় ‘সয়াল্যান্ড’ নামে। দেশে বিদেশে সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে আছে এমন বহু গুনী ব্যক্তির জন্ম এই লক্ষ্মীপুরে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত লেখক ও শিক্ষাবিদ নাজিম উদ্দিন মাহমুদ। লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ‘ নামে তাঁর একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে।

এছাড়াও রয়েছেন ভাষা সৈনিক কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক ও স্বাধীন দেশের প্রথম পতাকা উত্তোলক আ. স. ম. আব্দুর রব এর জন্ম এই লক্ষ্মীপুরে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক উপাধি প্রদান করেছিলেন। বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সানা উল্লাহ নুরী। ১৯৮২ সালে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় কৃতিত্বের জন্য একুশের রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান, দেশের সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান হামদর্দ এর চেয়ারম্যান ড. ইউসুফ হারূন ভূঁইয়া এ জেলারই কৃতি সন্তান। ‘উপকূল বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত বিশিষ্ট সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু, বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদারের জন্মও এ জেলায়।

মোহাম্মদ উল্লাহ বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এবং গণপরিষদের প্রথম স্পিকার, আবুল আহসান বিশিষ্ট কূটনীতিক এবং সার্ক এর প্রথম মহাসচিব, আব্দুল মতিন চৌধুরী পদার্থবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, রুহুল আমিন বাংলাদেশের ১৫ তম প্রধান বিচারপতি, সেলিনা হোসেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, মাহফুুজ আহমেদ অভিনেতা, তারিন জাহান অভিনেত্রী, রোজী আফসারী ও দিলারা জামান বিশিষ্ট চলচিত্র অভিনেত্রী।এ মহান ব্যক্তিদের জন্ম হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলায়।

এছাড়াও আরো অনেক গুনী ব্যক্তিবর্গ রয়েছে লক্ষ্মীপুরের, এবং লক্ষ্মীপুরের রয়েছে আরো অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান, আমি সংক্ষেপে কিছু তুলে ধরেছি। লক্ষ্মীপুর জেলা তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃৃৃতিক সৌন্দর্য ও ব্যক্তিবর্গ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র জেলা।যার সৌন্দর্য অতুলনীয়। এরপরও কেউ যদি লক্ষ্মীপুুর জেলাকে না চিনে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে তার অজানা রয়েছে। বাংলাদেশের কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ নিয়েও তাদের জ্ঞান শূন্যতা রয়েছ।তারা হয়তো কখনো জানতে চায়নি নিশাত মজুমদার, আ. স. ম. আব্দুর রবের মতো ব্যক্তিদের জন্মস্থান কোথায়।এসব বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকুক বা না থাকুক তবুুুও এ জেলায় জন্মগ্রহন করে আমি গর্বিত।

লেখক: নিগার সুলতানা, প্রথম বর্ষ, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *