ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: স্বরূপের সন্ধানে

জকে যদি ঘোষনা করা হয় কক্সবাজারে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। যার বার্ষিক বাজেট হবে ১০০০ কোটি টাকা। পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধা এবং অন্যান্য আধুনিক সুবিধাবলী যা যা লাগবে তার সবটুকুই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে। প্রায় ১০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া এতে কী হবে? স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবশ্যই এ বিষয়টি মেনে নিতে পারবে না। তাদের মনঃক্ষুণ হবে এটাই স্বাভাবিক ।

কেননা ১০০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পূর্ণাঙ্গ আবাসিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে নি। সেখানে একই মানের আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। ঠিক একই কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার বুদ্ধিজীবি শ্রেণি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করায় একটা যর্থাথ কারণ হতে পারে। এছাড়াও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও স্বার্থগত অনেকগুলো কারণও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধচারণে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল সেটি বলার অপেক্ষা রাখেনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যমন্ডিত সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সূতিকাগার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বরাবরই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে নিয়ামক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তীতে ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সর্বক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অগ্রণী।

কিন্তু বর্তমানে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের সেই গৌরবমন্ডিত স্বর্ণালী ইতিহাসের প্রতিবিম্ব আর দেখতে পাই না। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যে রাজনীতি দেখি সেটি আমাদের রীতিমত হতাশ করে। এখন রাজনীতি বলতে শুধু বুঝায় দলীয় লেজুড়বৃত্তি, হলে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করা, সর্বাক্ষণিক ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ বঝায় রেখে চলা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থতো বটেই দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথাও পর্যন্ত ছাত্রনেতাদের মনে তেমন কোনো দাগ কাটে বলে মনে হয় না। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে একটা একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করতে চায়। বিরোধী মতকে দমন করা জন্য যে কোনো কিছু করতে পিছপা হয় না। সবাই যেন ক্ষমতার দ্বন্ধে অবর্তীণ হয়।

একাত্তরে কতিপয় শিক্ষক বাদে সকল শিক্ষকই আমাদের স্বাধীনতার পক্ষ অবস্থান করেছিল। পাকিস্তানী বেয়নেটের সামনে নিজের বুক ছিতিয়ে দিয়েছিল। অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমান, অধ্যাপক মুহাম্মদ মুক্তাদির, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যেতির্ময় গুহঠাকুরতারা ইচ্ছা করলেই পশ্চিমাদের দালালী করতে পারতেন, নিজের ও পরিবারের সকলকে ঝুঁকিমুক্ত রেখে গাঁ ডাকা দিয়ে রাখতে পারতেন। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মচারীরা পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থান দেখে আমরা সত্যিই আশাহত হই।

শিক্ষকদের জাতীর বিবেক বলা হয়ে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেখানে জাতীর কর্ণধার বলে বিবেচিত। কিন্তু এই শিক্ষকরা যখন দেখি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে, সারাক্ষণ দলবাজী নিয়ে ব্যস্ত থাকে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ঘটায়, সর্বোপরি নিজের শিক্ষক পরিচয় ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় সর্বক্ষণ তৎপর থাকে তখন তাদের নৈতিককতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এবং শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের লজ্জিত হতে হয়। এসব কিছুর মাঝেও কতিপয় শিক্ষক যখন নিজের আদর্শে অবিচল থাকে, সার্বক্ষণিক শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করে, কোনো অন্যায় ও বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দেয় না তখন সেটি আমাদের মনে আশার আলো জাগায়।

অধিকাংশ ডিপার্টমেন্টেই শিক্ষক নিয়োগের যে প্রক্রিয়া সেখানে অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে যায়। প্রথমত, যাদের সিজিপিএ হাই তাদেরকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ বিষয়টি অত্যান্ত নিম্ন মানের লাগে। কেননা নিদিষ্ট কিছু নোট অনুসরণ করে খুব সহজেই হাই সিজিপিএ তোলা যায়। কিন্তু এটি শিক্ষক নিয়োগের মানদন্ড হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি এবং দলবাজীও প্রকান্ড আকারে বৃদ্ধমান। আজকাল নির্দিষ্ট দলভুক্ত না হলে শিক্ষক হওয়া দুঃসাধ্য হয়ে উঠে। এ কথাও প্রচলিত আছে যে নির্দিষ্ট দলে যোগ দিয়ে তার পর শিক্ষক হতে হয়। তৃতীয়ত, হাতে গোনা দু’একজন বাদে শিক্ষকদের ক্লাস তেমন প্রাণবন্ত নয়। শিক্ষকদের নেই কোনো মৌলিক গবেষনাপত্র। আমাদের এটা ও শুনতে হয় কিছু কিছু শিক্ষকদের থিসিস পেপার গুলা নকল। যদি উপস্থিতি না থাকতো তাহলে এক চতুর্থাংশ ছাত্র-ছাত্রী ক্লাসে খুঁজে পাওয়া যেতো কিনা সন্দেহ আছে। অথচ অতীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই ক্লাসে শিক্ষার্থীদের জায়গা দেওয়া যেত না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ১০০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও এটি সম্পূর্ণ আবাসিক হয়ে উঠতে পারেনি। একজন ছাত্রে নির্বিঘ্নভাবে পড়ালেখা করার জন্য সবার আগে প্রয়োজন হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং সু-স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। আর এই জন্য যেটি সবচেয়ে জরুরী সেটি হচ্ছে খাদ্য ও বাসস্থানের সু-ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ঠিক উল্টো চিত্রটি দেখতে পাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ। কিন্তু এখানকার ছাত্ররা বিশেষভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা যে মানবেতর জীবনযাপন করে যা বিশ্বাসযোগ্য না। হলের গণরুম গুলোতে ক্ষেত্রবিশেষে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকে। সামগ্রিকভাবে বিষয়টা যে কত কষ্টের তা বলে প্রকাশ করা যাবে না। অন্যান্য রুম গুলোও প্রায় মিনি গণরুমে পরিনত হয়েছে। ৪ জন শিক্ষার্থী থাকে যাবে এমন একটা রুমে প্রায় ১২-১৪ জন থাকে। একটা সিটে উঠার জন্য শিক্ষার্থীদের নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে পলিটিক্যাল মিছিল মিটিংয়ে যোগ দিতে হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা এক্ষেত্রে বেশী হয়রানীর স্বীকার হয়। অনেকক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়ার পরেও অনেক শিক্ষার্থী সিট পায়না। আর হলের ক্যান্টিনগুলোতে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তা তেমন ভালো মানের না ক্যান্টিনের পরিবেশও তেমন ভালো না। অনেক সময় বাসী খাবারও সরবরাহ করা হয় থাকে।

অনেকেই একটা বিষয় আক্ষেপের সাথে বলে থাকেন যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কেনো র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে নেই। আমি তো মনেকরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এরূপ ভঙ্গুর পরিস্থিতির মধ্যেও যে এটি ওয়াল্ড র‌্যাংকিংয়ে আছে সেটিই আমাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জ্ঞান তৈরী করা, নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করা প্রভৃতি। কিন্তু বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয় যেন বিসিএস ক্যডার তৈরীর কারখানায় পরিনত হয়েছে। আমি বিসিএস কে ছোট করে দেখছিনা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী যখন বিসএসকেই জীবনের পরম ব্রত হিসেবে ধরে নেয় তাহলে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তো বটেই জাতির জন্যেও একটি হতাশার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। উপরন্ত শিক্ষকদের তেমন কোনো মৌলিক গবেষনপত্র নেই, তৈরী করতে পারেনাই নিজস্ব মডেলের কোনো শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষকরা যখন দলবাজীতে ব্যস্ত থাকে তখন আর তাদের এসব করার সময় কোথায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিতের জন্য একমাত্র প্লাটফর্ম হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু)। এ ছাত্র সংসদ থেকেই বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে। তোফায়েল আহম্মেদ, আ.স.ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নারা এদেশে রাজনীতির উজ্জল নক্ষত্র। দীর্ঘ ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙ্গে অবশেষে গতবছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ইতোমধ্যে ডাকসুর মেয়াদ শেষ হয়েছে। ইশতেহার অনুযায়ী ডাকসু কতটুকু সফল হয়েছে সে দিকে না গিয়ে একট কথা অবিচলচিত্তে বলা যায় যে ২৮ বছরের অচলাবস্থার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের মধ্যে যে জবাবহীনতা ও স্বৈরতান্ত্রীকতা সৃষ্টি হয়েছে তা আস্তে আস্তে ভাঙ্গতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের মনের যে আশার বীজ সুপ্তাবস্থায় ছিল তা অঙ্গুরোদগম হতে শুরু করেছে। সচল থাকুক ডাকসু এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভূধ্যয়ের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে শৌর্য ও বীর্য দেখিয়েছে তা সত্যি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ বিশ্ববিদ্যালয় যুগে যুগে বহু জ্ঞানী-গুনীর জন্ম দিয়েছে। এ জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছাপিয়েও দেশের অন্যান্য স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সর্বোপরি দেশের সর্বস্তরের জনগনের এ বিদ্যাপিঠের কাছ থেকে প্রত্যাশার পারদও অনেক বেশী। এ বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের ট্যক্সের টাকায় চলে। তাই দেশের মানুষের প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক দায়বদ্ধতা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো উজ্জলতম স্থানে নিতে হলে প্রয়োজন একটি সুচিন্তিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট থেকে গবেষনা খাতে আরো বরাদ্ধ বাড়াতে হবে। এবং শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা বাড়াতে হবে। ক্যাম্পাসে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারার সূচনা করতে হবে। এ জন্য দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আমাদের প্রাণের আরাধ্য স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব হবে। চিরদিন ভাস্বর মহিমায় উজ্জল থাকুক প্রাণের বিদ্যাপিঠ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিরজীবী হোক।
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: খালেদ মাহমুদ, ২০১৮-২০১৯ সেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *