ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: পরিণত বয়সের আবেগ

একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখে হঠাৎ জেগে উঠলাম। বিষ্ময় কাটছে না, বার বার মনে হচ্ছে স্বপ্নটা সত্যি। স্বপ্ন দেখেছি আমার মরে যাওয়া বন্ধুকে নিয়ে, যে গত হয়েছে বছর তিনেক আগে।

 আমি যে এলাকায় বেড়ে উঠেছি সে এলাকায় বেশিরভাগ মেয়েরই মাধ্যমিক পাশের পর বিয়ে হয়ে যায়। এলাকাটি যে একদম গ্রাম তাও নয়।

স্কুলে আহামরি ছাত্রী ছিলাম তাও না, খাই-দাই ফুর্তি করার মত অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও এত স্পষ্ট ছিল না তখন।

লক্ষীপুর সরকারি কলেজে ভর্তি হবার পর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ভাল ধারণা হলো। দুজন বান্ধবী অনেক জানতো, তাদের সান্নিধ্যে থেকে জানা হলো- অনেক পড়তে হয়। আমিতো সবসময় ফাঁকিবাজ, এত পড়াশোনা কে করবে! তাও আগ্রহ ভালই ছিল।

আর তখন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাথায় ঘুরত। আমার কল্পনা শক্তি প্রবল। এমনভাবে কল্পনা করি যেনো বাস্তবে ঘটছে।অবশ্য বাস্তবে পরিপূর্ণতা পেয়েছে, সৃষ্টিকর্তা সে সুযোগ দিয়েছেনও।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বের পথ মসৃণ ছিল না। একটা ঘটনা না বললেই নয়, ২০১৫ সালের এসএইচসি এর লিখিত পরিক্ষার শেষদিন সিট পড়ে মহিলা কলেজ পুরাতন ক্যাম্পাসে। সেদিন সমাজকর্ম ২য় পত্র পরিক্ষা ছিল, লিখার জন্য তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে ওএমআর শিট ছিঁড়ে ফেলি, পরে এক স্যার জোড়া লাগিয়ে দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন ‘এমন আর করবে না, আমি বলেছিলাম স্যার আর পরিক্ষা নেই। পরিক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর উপলব্ধি হলো ফেইলই করবো বুঝি.! ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল।

যাই হোক অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান হলো ১৩ই অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে। পরিচিতদের কারও অনেক মন খারাপ হলো, কেউবা খুশি হলো।

 আমার খুশির মাত্রা একটু বেশি হবার কারণ ছিল, সাড়ে তিনবছর পর আমার স্কুলের বন্ধুকে পাওয়া।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রমের একেবারে শেষের দিকে ‘পে-ইন-স্লিপ’ হারিয়ে আসলাম এবং টের পেলাম ঢাকায় যাবার আগের দিন। মনে হলো ট্র্যাজেডিগুলো আমার সাথেই কেন হয়..!

 ২০১৬ সালের ৪ঠা জানুয়ারি আমার প্রথম ক্লাস ছিল কলাভবনের নিচতলায়। সেদিন ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ছিল, ক্যাম্পাসে অনেক মানুষের পদচারণা ছিল।

 বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার পর বুঝতে পারলাম আমাদের জেলার মানুষের সম্পর্কে অন্যজেলার মানুষের বিরুপ ধারণা। অনেকেই লক্ষীপুর বলতে নোয়াখালীকেই বোঝে। আবার অনেকেই বলেন নোয়াখালী লক্ষীপুর?। তবে এখন বেশিরভাগই লক্ষীপুর সম্পর্কে ভাল ধারণা পোষণ করে। একজন পরিচিত হলে গেস্ট হিসেবে উঠিয়ে দেন। ১২জানুয়ারি হলে উঠি। আমি যেদিন হলে উঠি মণি(রুপক নাম) ও সেদিন হলে উঠে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বন্ধু এবং বেডম্যাটও।

মণি আমার পিঠে বই হেলান দিয়ে ফোনের আলো দিয়ে রাত জেগে বই পড়তো। মানুষকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সে। মণিসহ আমরা গণরুমের সবাই প্রথম  ঘটা করে বসন্ত পালন করি। এরপর পহেলা বৈশাখ পালন করি, সাথে পুরো ক্যাম্পাস পইপই করে ঘুরে বেড়াই। এরই মাঝে একদিন আমাদের রুম দিয়ে দেয়। একদিকে আনন্দ হচ্ছিল আবার ভিন্ন ভিন্ন রুমে যাওয়াতে খারাপ লাগছিল। এরপর মণি হলে তেমন থাকতো না, বোনের বাসায় থাকতো। মাঝেমাঝে আসলে, হলের সামনে বেলাল ভাইয়ের দোকানের চা খাওয়া থেকে শুরু করে গল্পের আর শেষ নেই.!

 এভাবে টিরিংবিরিং করে ১ম বর্ষ শেষ হয়ে যায়। শখ্যতা বাড়তে থাকে রুমমেট আর বিভাগের বন্ধুদের সাথে। ২য় বর্ষে কিছুটা ভাব চলে আসে- বছরের প্রথম থেকেই কোপাকুপি পড়াশোনা করতে হবে। কিন্তু ঐ কোপানো বুঝি পরিক্ষার আগের দিন ছাড়া আর হয় না..!। বিভাগের বনভোজনগুলোতো অসাধারণ সব অভিজ্ঞতা।

 এরমধ্য হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটে যার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। ইদের পর এসে মণির সাথে আমার সোমবার দেখা হয় রোকেয়া হলের সামনে। মণিকে এত সামনে আনছি কারণ আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখন করে আছে সে।

২০ জুলাই  বৃহস্পতিবার (২০১৭) আমার ক্লাস ছিল না, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ ফোন পাই, মণি মারা গেছে। কেমন বোধ হচ্ছিল সেই অনুভূতি লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পাসে যাওয়া পর শুনলাম মণি আত্মহত্যা করেছে।

আমি আর আমার সেই স্কুলের বন্ধু মলচত্বরে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় আমাদের চোঁখ ছিল লাল, বৃষ্টির গুড়ি গুড়ি ফোটা আর চোঁখের ফোটা এক হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষিত পরিবারের আদরের ছোট মেয়েটা কেন এমন করলো আমাদের স্পষ্ট কিছু জানা ছিল না..! মনে হয় সেই মেয়েটা এখনও আছে পাশে- অদৃশ্য হয়ে।

 প্রকৃতির নিয়মে সব ব্যাপারই ম্লান হতে থাকে এটিও তেমন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয় জায়গার মধ্যে হল অন্যতম। হলে রুম হলো ছোট ছোট পরিবার। রুমে কতশত গল্প..! আর হলের অনুষ্ঠানগুলার কথা বলা বাহুল্য। বঙ্গমাতা হল থেকে ক্যাম্পাস প্রতি পাতায় পাতায় স্মৃতি আর অভিজ্ঞতায় ভরপুর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস পার্টি বন্ধুদের সাথে শখ্যতা তৈরির মাধ্যম। বনভোজন শিক্ষক বড়-ছোটদের সাথে শখ্যতা তৈরির অন্যতম মাধ্যম।

 শেষ বর্ষের অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘রেগ ডে’ এবং ‘ব্যাচ ট্যুর’। এর মাধ্যমেই মনে হয় বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠে। রেগ ডের সেই তিনদিন আর ব্যাচ ট্যুরের সেই সাতদিনের কথা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। শুধু বলবো সেগুলোকে বাদ না দিলেই অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে যুক্ত হবে নতুন নতুন জিনিস। 

 একটা কথা প্রায় সময় বলা হয়,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর দিয়ে চললেও শেখা যায়। খাপ খাইয়ে নেওয়া, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, কাউকে ছোট করে না দেখা, সমঝোতা করা, বিবেচনা করে কাজ করা, পরখ করার ক্ষমতা সর্বোপরি উত্তম ব্যক্তিত্ব ধারণ ও প্রকাশ করার এক বড় পরিসর হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এ নাতিদীর্ঘ জীবন মানুষ চেনার হাটও বটে। ব্যক্তিত্ব এক অসাধারণ গুণ। ব্যক্তিত্বের কারণে মানুষের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

আমাদের চূড়ান্ত পরিক্ষা শেষ হয় ২৪ ডিসেম্বর। মাস্টার্সের ক্লাস শুরু হয় এবছরের ৫ জানুয়ারি। স্যাররা বলেছিলেন,’এখন এত ছুটি দিয়ে কি করবা..! রোজায় অনেক ছুটি পাবা’।

এখন এত ছুটি পেয়েছি- আর এমন ছুটি চাই না জীবনে। মার্চ মাস থেকে আজ অবদি ঘরে। বৈশাখ এসে চলে গেল, জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণেরও শেষ দিকে। পৃথিবীর অসুখ ছাড়ছে না। অদৃশ্য এই শক্তির কাছে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার মানুষ। গুণী মানুষের সংখ্যাও কম নয়। অদৃশ্য এ শক্তির বিরুদ্ধে যখন সবাই যুদ্ধ করছে, তখন কিছু মানুষের হিংস্র কর্মের শেষ হয় না, যেগুলো পীড়াও দেয়।

শত বছরে শত-হাজার ঘটনার সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূচনা করে এসেছে সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ঐ রাজু ভাস্কর্য। সাবেকী আমলের ঐতিহ্য সংস্কৃতির প্রতীক কার্জন হল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কালজয়ী ভাষণ, তিন নেতার মাজার। বই মেলা, বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চ আর দোয়েল চত্বর, চারুকলার বকুল তলার চৈত্র সংক্রান্তি আর বিশ্ব ঐতিহ্যের মঙ্গল শোভাযাত্রা তুলে ধরে বাংলা আর বাংলাদেশকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে “পরিণত বয়সের আবেগ”। শ্যাডোর চা, লুচি-ডাল, ডাকসুর পাশের পানিপুরি, ডাকসুর চা-সিঙ্গারা-সমুচা, কার্জনের গেইটের ভেলপুরি আর সবার প্রিয় টিএসসি। আবেগ ভালোবাসা আর প্যারার ক্লাসরুমগুলো সবই আগের মতই থাকবে। শত তরুণ তরুণীর স্বপ্নের লাল বাস দাপিয়ে বেড়াবে পুরো ক্যাম্পাস, ব্যবসা শিক্ষা অনুষদ দাড়িয়ে থাকবে ক্রাশ খাওয়ানোর জন্য, লাল কার্জনের সৌন্দর্য আর ল্যাবের প্যারা থাকবে অম্লান হয়ে।

নবীনদের প্রবেশের মধ্য দিয়ে চলে যেতে হবে প্রাক্তনদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামক এই মঞ্চটা চিরঅনন্ত যৌবনা হয়ে আছে এবং থাকবে। স্ক্রিপ্টগুলোও প্রায় একই আছে, শুধু সময়ের স্রোতে বদলে যায় অভিনেতা -অভিনেত্রীরা। এবং বেশিরভাগই ভাল অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করে।

 আবারও সময়ের পরিক্রমায় মলচত্বরে জারুলের আগমন ঘটবে, জেমস্ কিংবা মমতাজের গানে ঝংকার তুলবে মলচত্বরে ,নতুন মুখ এসে ভিড় জমাবে টিএসসিতে আর মধুতে, আর্থিক কষ্ট বা মানসিক কষ্টকে আড়াল করে ভাল থাকার অভিনয় করে গ্রন্থাগারে পড়তে যাবে।

সমাজবিজ্ঞান চত্বর, হাকিম বা শ্যাডোর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে স্বপ্ন দেখবে সফল মানুষ হতে, প্রজাতন্ত্রের আমলা থেকে শুরু করে সফল উদ্যোগতা।

এদের থেকেই কেউ কেউ হবে ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধু,আনিসুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন,হুমায়ুন আহমেদ, শিরিন শারমিন চৌধুরী, সত্যেন বোস, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ কিংবা জিসি দেব।

 পৃথিবীর অসুখ সেরে যাক, ক্যাম্পাস তার আপন ছন্দে দ্রুত ফিরুক। আম তলা, বট তলা আপনরুপে ফিরুক,অপরাজিতা চায়ের চুমুকে গল্প আড্ডায় ভরে উঠুক পায়রা চত্বর, জমে উঠুক সবুজ চত্বরের আড্ডা,সাজানো চুড়ির মেলা বসুক ডাচে্র পাশে, ছবি তোলায় ধুম পড়ুক শহীদুল্লাহ হলের পুকুর পাড়, অপরাজেয় বাংলাসহ প্রত্যেকটা আঙ্গিনায়। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


লেখক: তানজিদা আক্তার নিসু, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী

     

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *