দুর্নীতি একটি ব্যাধি

দুর্নীতি বিশ্ববাসীর জন্য একটি অভিশাপ। যে দেশে দুর্নীতি প্রবণতা যত বেশি, সে দেশের উন্নয়নের হার তত কম। আবার, যে দেশে নীতি-নৈতিকতা এবং ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অনুশীলন যত বেশি, সে দেশে দুর্নীতি প্রবণতা তত কম।

অন্যদিকে, আইনের শাসন বলবৎ থাকলে দুর্নীতির হার হ্রাস পায়। দুর্নীতি পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় জীবনে বিপর্যয় নিয়ে আসে।

দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়তে হলে, দুর্নীতির কারণ, ফলাফল ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে হবে।


যে কোন বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভ করার জন্য উক্ত বিষয়ের পরিচয় ও স্বরূপ জানতে হবে। যথোপযুক্ত কারণে, আমরা প্রথমেই দুর্নীতির সংজ্ঞা নিয়ে আলোকপাত করবো।
Merriam Webster Dictionary-তে বলা হয়েছে- “dishonest or illegal behavior especially by powerful people (such as government officials or police officers)”

অর্থাৎ বিশেষভাবে, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিবর্গের ( যেমন- সরকারি আমলারা বা পুলিশ কর্মকর্তাবৃন্দ)। দুর্নীতি সম্পর্কে World Bank-এর সংজ্ঞা হলো- Corruption is the abuse of public power for private benefit. অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করাই হলো দুর্নীতি। Transparency International দুর্নীতি সম্পর্কে নিম্নোক্ত সংজ্ঞা প্রদান করে- Corruption is the abuse of entrusted power for private gain. অর্থাৎ দুর্নীতি হলো -ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার।


সংজ্ঞায়নের পর, এখন আমরা দুর্নীতির প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করবো।

  • ১) ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার অভাব: একজন মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ না থাকলে, তার দ্বারা খুব সহজেই দুর্নীতি হতে পারে। আবার, নীতি-নৈতিকতা না থাকলে, একজন মানুষ পশুর সমান অথবা তার চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে।
  • ২) অত্যধিক সম্পদের লোভ: কোন কোন যতটুকু আয় করে, তা নিয়ে তুষ্ট হতে পারে না। তারা যত পায়, তত চায়। আর, লোভী ব্যক্তিরাই সাধারণত বেশি দুর্নীতিপরায়ণ হয়। সাবেক দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ “দুর্নীতি প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মের করণীয়” শীর্ষক এক কর্মশালায় বলেন- ” দেশের অর্থনীতি এখন অনেক অন্তর্ভুক্তিমূলক। তাই অভাবের কারণে খুব বেশি দুর্নীতি হয় না। বরং দুর্নীতি যা হচ্ছে, তা অতি লোভের কারণেই।”
  • ৩) আইনের শাসনের অভাব: অনেক দেশেই অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন তথা দুর্নীতি বিরোধী অনেক আইন থাকলেও সেগুলো সচরাচর প্রয়োগ করা হয় না। ফলস্বরূপ, দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। আবার, কখনো সেই সকল আইন শুধুমাত্র দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, ক্ষমতাশালীদের সেই আইন খুব কমই কার্যকর করা হয়। গ্রামে একটি কথা প্রচলিত আছে- ” আইনের জালে পুঁটি-টেংরাগুলো ধরা পড়ে, আর রুই-কাতলগুলো বেরিয়ে যায়
  • ৪) জবাবদিহিতার অভাব: কোন একজন কর্মকর্তাকে যদি তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে না হয়, তবে সে নিজের ইচ্ছানুযায়ী কার্য সিদ্ধি করবে। অধিকন্তু, সরকারি অর্থের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করবে।
  • ৫) অভ্যাস: দুর্নীতি করতে করতে কিছু মানুষের তা অভ্যাসে পরিণত হয়। আর, অনেক সময়ই চাইলেও খুব সহজে অভ্যাস পরিত্যাগ করা যায় না। একটি প্রবাদ আছে- “কয়লা ধুইলেও ময়লা যায় না।”
  • ৬)গ্রেড বা বেতন স্কেল: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি একই কাজ করা সত্ত্বেও দুজনের পদ ভিন্ন এবং বেতনেরও বেশ পার্থক্য। ফলস্বরূপ, হিংসাপরায়ণ হয়েই নিম্ন পদের ব্যক্তি দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে।


দুর্নীতির কারণসমূহ আলোচনার পর আমরা এখন এর পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করবো। Transparency International – দুর্নীতির ৭টি পরিণতির কথা তুলে ধরেছে। নিচে আমরা সেগুলো বিস্তারিত বর্ণনা বর্ণনা। প্রথমেই Transparency International এর উদ্বৃতিটি তুলে ধরা হলো- ” Corruption erodes trust, weakens democracy, hampers economic development and further exacerbates inequality, poverty, social division and the environmental crisis.” অর্থাৎ দুর্নীতি বিশ্বাস হ্রাস করে, গণতন্ত্রকে দুর্বল করে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটায় এবং, অধিকন্তু, বৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক বিভাজন ও পরিবেশগত সঙ্কটকে বাড়িয়ে তোলে।

  • ১) বিশ্বাসহীনতা: একজন ব্যক্তি দুর্নীতি অবলম্বন করলে, সে সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ফলে, কোন কোম্পানি, সংগঠন বা একজন সাধারণ নাগরিক ঐ ব্যক্তিকে সৎ লোক হিসেবে কখনোই বিবেচনা করে না।
  • ২) গণতন্ত্রের শক্তি হ্রাস: একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা দুর্নীতি পরায়ণ হলে, উক্ত দেশে গণতন্ত্রের ভিত ভেঙ্গে যায়। ফলে, উক্ত রাজনৈতিক দলের পতন ত্বরান্বিত হয়। তাছাড়া, উক্ত দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও কমে যায়।
  • ৩) অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা: দুর্নীতির সবচেয়ে করুণ পরিণতি হলো- একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাঘাত সৃষ্টিকরণ। যার ফলে, দেশটির উন্নয়নের গতি হ্রাস পায় এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। বরং অনেকটা পিছিয়ে থাকে।
  • ৪) বৈষম্য: দুর্নীতির ফলে ধনীরা আরো ধনী হয়, গরীবরা আরো গরীব হয়। উদাহরণস্বরূপ- আমাদের দেশের করোনাকালীন সময়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ কর্তৃক সরকারের পাঠানো ত্রাণ (চাল) চুরি করার ঘটনার কথা তুলে ধরা যায়।
  • ৫) দারিদ্র্য: দুর্নীতির ফলে দারিদ্র্যের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। যারা দুর্নীতি করে, তারা সাধারণত খেটে-খাওয়া, দিন আনে দিন খায় এধরনের শ্রমিক-মজুর লোকদের কাছ থেকেই অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ আদায় করে। পরিণামে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যায়।
  • ৬) পরিবেশগত সঙ্কট: সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অর্থ ব্যয় না করে, নিম্নমানের বস্তু ব্যবহার করার ফলে, প্রায়ই দেখা যায় নতুন নির্মিত ভবন বা সেতুর স্প্যান ধ্বসে পড়তে দেখা যায়। আবার, নতুন নির্মিত রাস্তা-ঘাটও নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বেই মেরামত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।
  • দুর্নীতির কারণ ও পরিণতি আলোচনা করার পর আমরা, পরিশেষে, দুর্নীতির প্রতিকার নিয়ে আলোকপাত করবো। দুর্নীতি রুখতে টিআইবির ১২ টি সুপারিশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ৭টি সুপারিশকে আমরা এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেব।
  • ১)সেবা খাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা: অন্যান্য খাতের তুলনায় সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ অনেক বেশি। তাই , জড়িতদের বিরুদ্ধে যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ২) বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি দুদকের অনুসন্ধান: যৌথ প্রচেষ্টার ফলে, তাড়াতাড়ি ও যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তাই, একযোগে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • ৩) নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন: নৈতিকতার অভাব হলে মানুষ দুর্নীতি পরায়ণ হয়।
  • ৪) পুরস্কার, তিরস্কার বা শাস্তির ব্যাবস্থা: ভালো সেবা দানের জন্য পুরস্কার প্রদান। অবৈধ উপায় অবলম্বন করার জন্য তিরস্কার ও শাস্তি একান্ত প্রয়োজনীয়।
  • ৫) জনগণের অংশগ্রহণ: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে, গণশুনানির মতো জনগণের অংশগ্রহণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।
  • ৬) তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি: তথ্য- প্রযুক্তির ব্যবহার বিশেষ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করলে স্বচ্ছতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
  • ৭) রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তার কার্যকর প্রয়োগ: সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে। যাতে সর্বস্তরের জনগণ সমান সুযোগ-সুবিধা লাভ করে।


পরিশেষে, একথা বলতে হয় যে, দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রতিটি ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার না হলে দুর্নীতির মুলোৎপাটন করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই, আমাদের সকলকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একযোগে শপথ করতে হবে। তবেই, আমরা দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে সচেষ্ট হবো।

লেখক: মোঃ রাকিব হোসেন, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৭-১৮

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *