ধর্ষণ: প্রতিকার ও প্রতিরোধ

পৃথিবীর সাড়ে চার মিলিয়ন বছরের ইতিহাসে একমাত্র সভ্য প্রজাতির পরিচয়ে দাপিয়ে বেড়ানো জীবের নাম মানুষ। যান্ত্রিকতায় সভ্যতার ছাপ থাকলেও মনের দিক থেকে কি আমরা আদৌও সভ্য হতে পেরেছি ? সভ্য পৃথিবীর আনাচে-কানাচে অসংখ্য অসভ্যতার বেড়াজালের মাঝে অন্যতম হলো ধর্ষণ। পৃথিবীর সব উন্নত, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশই কমবেশি ধর্ষণের প্রবল গ্রাসে নিমজ্জিত। যান্ত্রিক সভ্যতায় উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া কোন দেশই ধর্ষণের প্রভাব বলয়ের বাহিরে নয়৷ অনুকরণপ্রিয় বাঙ্গালিও এই সূচকে পিছয়ে নেই মোটেই৷ অন্যান্য দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের সমাজে ধর্ষণের ব্যাপকতা। কর্মস্থলে, বাসে, ঘরে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীরা প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, রেহাই পাচ্ছে না শিশু আর বৃদ্ধারাও।

ঘটনাগুলো এতটাই নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে যে আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করারও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি না৷ মাঝেমধ্যে কিছু ধর্ষণের ঘটনায় আমরা কিছুটা নড়েচড়ে বসি, ক্ষুব্ধ হই, আলোচনা-সমালোচনা করি, সমবেদনা প্রকাশ করি তারপর দিনরাত্রির আবর্তনে অসংখ্য অঘটনের মাঝে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ধর্ষণের বদলে অন্য ঘটনা স্থান করে নেয়, কিছুদিন পর এমন ঘটনা আবার ঘটে। এভাবে ধর্ষণের দুষ্টচক্রে আমাদের সমাজ প্রতিনিয়ত আবর্তিত হতে থাকে৷

কিছুদিন আগেও হিরা মণির মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের বিবেকের বন্ধ দরজায় কড়া নেড়ে গেছে। হিরা মণির ঘটনায় অনেকে কষ্ট পেয়েছে, তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কিন্তু হিরা মণি কি এই বর্বরোচিত আক্রমণের প্রথম শিকার ? তনুর কথা কি আমাদের মনে আছে ? বা সুবর্ণ চরের ঘটনায় কি এখনো আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় ? তারা কি সুবিচার পেয়েছে ?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘না’ হয় তাহলে এটা প্রমাণ হয়ে যায় যে, বিচার পাওয়া না পাওয়াতে আমাদের তেমন কিছু আসে যায় না। আমরা যেটুকু কষ্ট পাই সেটা সাময়িক এবং সময়ের আবর্তনের সাথে সাথে কষ্টটাও মুছে যায়৷

হিরা মণি বিচার পাবে কি পাবে না, সেটা জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে ধর্ষকের রাজনৈতিক সংযুক্তি বা রাষ্ট্রযন্ত্রের আইন প্রয়োগের মানসিকতার উপর৷ সুবর্ণচরের গৃহবধূ, তনু কিংবা হিরা মণি ছাড়াও অসংখ্য মা-বোন এই বর্বরতার শিকার হয়েছে।
আইন ও সলিশ কেন্দ্র (আসক) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী- ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭৩২জন৷ শুধুমাত্র ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী৷ যৌন হয়রানীর শিকার ১৮ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে চারজন নারীসহ ১৭ জন হত্যার শিকার হয়েছেন৷ যৌন হয়রানীর প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৪৪ পুরুষও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷

বাংলাদেশর অধিকাংশ সেকুলার বুদ্ধিজীবীর মতে নারী-পুরুষোর বৈষম্য দূর করার মাধ্যমেই ধর্ষণ মুক্ত সমাজ বিনির্মান সম্ভব। তাদের থিওরি বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ, ধর্ষণের উর্বর ভূমিগুলো যেমন আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, সুইডেন, ব্রিটেন, কানাডা কিংবা জার্মানির দিকে তাকালে দেখা যায় নারী পুরুষের বৈষম্য সূচকে তারা সবচেয়ে সভ্য রাষ্ট্র, কিন্তু ধর্ষণের মহামারিতে বিপর্যস্ত। অন্যদিকে নারী পুরুষের সমানাধিকার বা সমতার মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ধর্ষণের প্রকোপ তুলনামূলক কম৷
উন্নত দেশগুলোতে ধর্ষণের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সেসব দেশে হয়তো আইনের শাসনের অভাব নয়তো নৈতিকত মূল্যবোধের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে চীন, উত্তর কোরিয়া, মিসর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আফগানিস্তানে তুলনামূলক কঠিন শাস্তির কারণে ধর্ষণের ঘটনা কম ঘটছে।

ধর্ষণকে সাধারণত একজন পুরুষের জৈবিক তাড়না হিসেবে দেখা হলেও এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে সংগঠিত হয়ে থাকে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিচার করলে ধর্ষণের পেছনে ব্যার্থতা, হতাশা, নারীবিদ্বেষী মনোভাব, ক্ষোভ, আক্রোশসহ বেশ কিছু বিষয় কাজ করে। কিন্তু হতাশা, ব্যার্থতা কিংবা নারীবিদ্বেষী মনোভাব কি ধর্ষণের যৌক্তিক কারণে হতে পারে ?

ধর্ষকের এই হতাশা কিংবা ব্যার্থতা কি সামাজের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য ? তাহলে কিছু কিছু সমাজে মানবতার স্লোগান তুলে ধর্ষকের এসব অনুভূতি কিছুটা সহানুভূতির চোখে দেখা হয় কেন ? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে একটু পেছনে তাকাতে হলেও ফলাফল কিন্তু আমাদের নিকট স্পষ্ট, নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণেই একজন পুরুষ ধর্ষক হয়৷

ধর্ষণের মহামারি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হলে একমাত্র প্রতিকার হলো ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা৷ এই মহাসত্য সবাই উপলব্ধি করতে পারার পরেও আইন সংক্রান্ত জটিলতা ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতর জন্য আমাদের দেশে ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের আইন সংক্রান্ত সামান্য বিতর্ক থাকলেও আইন প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আছে। ছোটবেলা থেকে একটা ব্যাঙ্গাত্মক প্রবাদ আমরা শুনে এসেছি ‘কাজীর গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই’৷ আমাদের ধর্ষণ সংক্রান্ত আইন অনেকটা কাজীর গরুর মত কাগজে অনেকিছু থাকলেও বাস্তবে ছিটেফোঁটাও নেই৷

বাংলাদেশের বিচার ব্যাবস্থা অনুযায়ী একজন নারীকে ধর্ষণের বিচার পেতে হলে প্রথমে থানায় যেতে হয়। এক্ষেত্রে থানা-পুলিশের আচরণও বড় অদ্ভুত। সঠিক বিচারের আশ্বাসের পরিবর্তে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করে হেনস্তা করা হয় ৷ ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় ওসি কর্তৃক নুসরাতকে হেনস্তা করার ভিডিও এখনো অনলাইনে পাওয়া যায়৷ নুসরাতের ভাগ্য হয়তো সুপ্রসন্ন ছিল, ওসি ভিডিও করেই ক্ষান্ত হয়েছে। নয়তো থানায় ধর্ষণের মামলা করতে গিয়ে পূনরায় ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনাও এদেশে কম নয়!

তদন্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ১৮৭২ সাল থেকে প্রচলিত ছিল ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নামে এক বিতর্কিত নিরীক্ষণ পদ্ধতি, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যার কোন ভিত্তি নেই কিন্তু এই সত্যটা বুঝতে আমাদের ২০১৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ধর্ষিতার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করে আদালতে। আসামি পক্ষের আইনজীবীর জেনেশুনে ধর্ষককে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য বেশ কিছু কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু পদ্ধতি হলো আদালতে সবার সামনে বারবার ধর্ষণের ঘটনা শুনতে চাওয়া ও সেখান থেকে ঘটনার অসংগতি বের করা৷ আদালতে প্রশ্ন করা হয় কেন তাকে রেপ করা হলো ? কেন সে ওখানে গিয়েছিল ? অন্যদের তো ধর্ষণ করা হয়নি, তাহলে তোমাকে কেন করলো ? ধর্ষণের সময় বাধা দেয়নি কেন ? এবং ধর্ষিতার চরিত্র বা সতীত্ব নিয়ে অশালীন প্রশ্ন তোলা হয়৷ দুর্ভাগ্যবশত আদালত চাইলেও এমন প্রশ্নে আসামিপক্ষের আইনজীবীকে বাধা দিতে পারে না, সর্বোচ্চ প্রশ্নের ধরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে৷ আদালতের এই অক্ষমতার কারণে এখানে প্রশ্ন থেকে যায় যে, চরিত্রহীন মহিলাকে জোর করে যৌনাচার করলে সেটা কি ধর্ষণ হবে না ? এই আইনি ভিত্তির ফলেই আসামি পক্ষের আইনজীবী ধর্ষিতাকে হেনস্তা করতে কিংবা ধর্ষণের সময় তার সম্মতি ছিলো এটা প্রমাণ করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কারণ ধর্ষিতা তাকে টাকা দেয় না, তাকে টাকা দেয় ধর্ষক৷

বাংলাদেশে ধর্ষণের শিকার অধিকাংশ নারী ও শিশু সামাজিকভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের। যার ফলে এই মানুষগুলো মামলা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ কম পায় আর যারা সুযোগ পায় তারা সাধারণত ন্যায়বিচার পায় না কারণ তারা প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও মর্যাদা ভালো থাকার ফলে আইন-আদালতের জটিল পথ পাড়ি দিয়ে সুবিচার পাওয়া অধিকাংশ ধর্ষিতার পক্ষেই সম্ভব হয় না।


তাহলে কতজন পায় সুবিচার ? উত্তরটা দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘নারীপক্ষ’। তাদের মতে ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৪৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের। এই পর্যবেক্ষণটাই বলে দিচ্ছে আমাদের দেশে ধর্ষণের অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির কারণ।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আইনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা উচিত। আমাদের সাক্ষ্য আইনে ১৫৫ ধারার ৪ নং উপ-ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি যখন ধর্ষণ বা বলৎকার চেষ্টার অভিযোগে ফৌজদারীতে সোপর্দ হয়, তখন দেখানো যেতে পারে যে, অভিযোগকারিণী সাধারণভাবে দুশ্চরিত্রা। এই আইনের সুযোগ নিয়ে ধর্ষিতাকে আদালতে দ্বিতীয়বার জনসম্মুখে ধর্ষণ করা হয়, তাই এ দিকটির নেতিবাচক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। মামলায় অভিযুক্তপক্ষ কর্তৃক আদালতে ধর্ষিতাকে জেরা করার বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিমকোট বলেন, “অভিযোগকারীর সত্যনিষ্ঠা এবং তার সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা জেরা করার মাধ্যমে যাচাই করার জন্য অভিযুক্তকে যেমন স্বাধীনতা দেয়া উচিত, তেমনিভাবে আদালতকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে ধর্ষিতাকে হয়রানি বা অবমানিত করার জন্য জেরা করা হচ্ছে কি-না। স্মরণ রাখতে হবে, ধর্ষণের শিকার নারী ইতোমধ্যে দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং তাকে যদি ঐ অপরিচিত ঘটনার শিকার হওয়া নিয়ে পুনরাবৃত্তি করতে হয় তাহলে সে লজ্জায় নির্বাক হয়ে থাকতে পারে এবং তার নিরবতাকে ভুল করে সাক্ষ্যের অমিল এবং স্ববিরোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকতে পারে”৷ ভারতে যেভাবে সংশোধন করা হয়েছে আমাদের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ নং উপধারার সংশোধন করা প্রয়োজন। সেই সাথে আমাদের অন্যান্য সমস্যা হলো আইনের আশ্রয় পেতে চাইলে উকিল নিয়োগ, অর্থনৈতিক ঝামেলা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, ফাঁসির পূর্বে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদান। আইনের এসব দুর্বলতাগুলো সর্বদা রাজনীতি ও অপরাধীর স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে৷ সর্বোপরি এই বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত এলিট শ্রেণীর স্বার্থই রক্ষা করে চলছে৷

মানব রচিত আইন সমালোচনা ও জটিলতাপূর্ণ তাই আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধানের প্রয়োগের মাধ্যমেই সমালোচনা মুক্ত গ্রহনযোগ্য সমাধান সম্ভম৷ ধর্ষণ বা ব্যভিচারের ক্ষেত্রে ইসলামি আইন হলো অবিবাহিতের জন্য আশিটি বেত্রাঘাত আর বিবাহিতের জন্য পাথর মেরে হত্যা (রজম)৷ এছাড়া বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামি আইনের কিছু বৈশিষ্ট্য হলো- অভিযোগের সাথে সাথে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া, অভিযোগকারীর অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা পোহাতে হয় না, অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য দালালের (উকিল) প্রয়োজন হয় না, সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়, বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত হলে ক্ষমা করে দেয়ার অধিকার খোদ রাষ্ট্রপ্রধানের থাকে না এবং হত্যা যোগ্য অপরাধের শাস্তি প্রকাশ্যে দেওয়া হয় যাতে সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য এটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে৷ ইসলামি আইনেরও হয়তো তাত্ত্বিক সমালোচনা সম্ভব কিন্তু অপরাধ প্রতিকারের এটিই সর্বোৎকৃষ্ট পথ৷

ধর্ষণের মোকাবেলায় আইন সবসময় কার্যকর হবে না করণ অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ধর্ষিতা সামাজিক ভয়ে বিচারের আওতায় আসতে চায় না, ধর্ষকের সামাজিক অবস্থানের ভয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারে না, সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারা সহ বিভিন্ন কারণে ধর্ষণ প্রতিরোধে আইন সবসময় কার্যকর হয় না৷ তাছাড়া একটা প্রবাদ আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি “Prevention is better then Cure” ”প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম”৷ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও যদি আমরা একই নীতি অনুসরণ করি তাহলে আইন তৈরি করে ধর্ষণের প্রতিকার না করে প্রতিরোধের উপায় বের করতে হবে। প্রতিরোধের গতানুগতিক তাত্ত্বিক পদ্ধতিগুলো হলো

(১) সাহিত্যে অশালীনতা পরিহার:
সাহিত্য হওয়া উচিত ব্যক্তির চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠন উপযোগী কিন্তু পৃথিবীর অনান্য সাহিত্যের মত বাংলা সাহিত্যেও বিকল্প ধারার কিছু লেখক রয়েছে। এসব সাহিত্যিকরা নারীবাদী স্লোগান দিলেও তাদের সাহিত্যের আনাচে-কানাচে নারীকে অশ্লীল ভাবে উপস্থাপন করা থাকে, কোথাও কোথাও নিজ মেয়েকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতেও তাদের বিবেকে বাঁধেনি৷ অশ্লীল সাহিত্যকর্ম সমাজের জন্য অভিশাপ, এগুলো সমাজের নৈতিক ভিত্তি দূর্বল করে দেয়, ধর্ষণসহ অনেক সামাজিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়৷ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যেমন অসংখ্য চটি সাহিত্যিক ছিলো তেমনি বর্তমানেও তাদের উত্তরসূরিরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে৷ এই মানের সাহিত্যিকের সাথে লাইন ধরে সেলফি তোলার নির্লজ্জ মানসিকতার পরিচয় আমরা দিয়েছি৷ এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক এবং চারিত্রিক অধপাতের সাচ্চা নিদর্শন।

(২) বিনোদনের নামে অশ্লীলতা রোধ:
ইট-পাথরের পৃথিবীর ক্লান্ত লগ্ন শেষে মানসিক প্রফুল্লতার জন্য বিনোদনের প্রয়োজনীয়তা সবাই অনুভব করে৷ কিন্তু নৈতিকতার মানদণ্ডে অসুস্থ বিনোদন প্রশান্তির পরিবর্তে নষ্ট করে দেয় আমাদের চারিত্রিক গুণাবলি। বিনোদনের নমে খাওয়ানো হয় অশ্লীলতা আর বেহায়াপনা। অবসরে আত্ম প্রশান্তির জন্য সবাই তাকিয়ে থাকে অর্ধ-উলঙ্গ নায়ক নায়িকাদের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গীর দিকে; যেখানে ভদ্রতার চেয়ে নগ্নতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রমাণ করা হয়- এটাই আধুনিকতা৷ বস্তুত সেই আধুনিকতার খোলসে অনুকরণপ্রিয় অপসংস্কৃতি ছাড়া অন্যকিছু পাওয়া যায় না৷ তারা যে সমাজের অনুকরণ করতে চায় সে সমাজ ধর্ষণের শীর্ষে, সে সমাজে পরিবার ব্যাবস্থা হুমকির মুখে, উলঙ্গ হওয়াকে তারা সভ্যতা মনে করে, যাদের চিন্তাচেতনা ভোগদখল কেন্দ্রিক, যারা নারী অধিকারের স্লোগান দিয়ে নারীদের ঘর থেকে বের করে আনে চক্ষু লালসা মেটানোর জন্য, তাদের বিজ্ঞাপনে পন্যের চেয়ে নারীকে অধিক ফুটিয়ে তোলে। এইসব প্রক্রিয়ায় সুস্থ বিবেকবান মানুষকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় নীল পর্দার জগতে যেখানে বিকৃত ও অপরাধমূলক যৌনাচারকে স্বভাবিকভাবে তুলে ধরা হয়৷ যে সমাজ আধুনিকতার নামে ধর্ষণসহ অনান্য বিকৃত ও অপরাধমূলক যৌনাচারকে স্বাভাবিক করে দেখায় সে সমাজে ধর্ষণ বন্ধ হবে কেন ? আমাদের কি চিন্তা করা উচিত নয় যে, তাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা যদি এতটাই উন্নত হয় তাহলে তাদের সমাজের কেন এই দূর্দশা ? বস্তুত যান্ত্রিক সভ্যতায় তারা আমাদের চেয়ে উন্নত হলেও সমাজ-সাংস্কৃতি-মূল্যবোধের বিবেচনায় এখনো নিরেট বর্বর।

কবির ভাষায়- আধুনিকতার পরশে হয়ে চলেছি ভীষণ সভ্য/ যে সভ্যতার লাগে না কোন বস্ত্র,যেন বর্বরতম নির্লজ্জ কোন দ্রব্য।/

(৩) চিন্তার স্বচ্ছতা:
ধর্ষণ একটি সামাজিক অপরাধ এবং সমাজে প্রচলিত কিছু বিশ্বাস ধর্ষণের ইন্ধন যোগায়। যেমন কেউ কেউ মনে করে, রাতে নারীদের একাকী চলাফেরা ধর্ষিতা হওয়ার কারণ। নারী পোষাক ও চালচলনের কারণে ধর্ষণের স্বীকার হয়৷ এ ব্যাপারে একটা বিখ্যাত উদাহরণ ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি ”কলার খোসা না থাকলে মাছি বসাটা স্বাভাবিক”। মাছির স্বভাব হলো ফলের উপরে বসা, খোসা থাকুক বা না থাকুক তাহলে কি পুরুষের ক্ষেত্রেও এটা বলা যায় যে পুরষের চরিত্র হলো ধর্ষণ করা ? এক্ষেত্রে চুপ থেকে কি আমরা পুরুষ বিদ্বেষী তথাকথিত নারীবাদীদের একথা মেনে নিচ্ছি যে, পুরুষ মাত্রই ধর্ষক ? একটা মেয়ের অশালীন পোষাক তার রুচি বা চারিত্রিক অবক্ষয়ের নির্দেশক হলেও সেটা ধর্ষণের কারণ নয়৷ ধর্ষণ সংগঠিত হয় সামাজিকভাবে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটলে কিংবা আইনের শাসনের অভাব থাকলে৷

এইসব পদ্ধতিগুলো যদি ধর্ষণ প্রতিরোধের চূড়ান্ত উপায় হয় তাহলে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কিভাবে এসব বিষয় আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে চর্চা করবো ? ব্যক্তির সমন্বয়ে যেহেতু সমাজ-রাষ্ট্র গঠিত তাই আমরা আলোচনা করবো কিভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে এইসব অসংগতি দূর করে সমাজ-রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ষণ প্রতিরোধে করা যায়৷

ব্যক্তিগত আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সমাজের প্রধান বিচারক ধর্ম এবং ধর্মের বিপরীতে যারা সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে তারা নিজেদের পরিচয় দেয় নাস্তিক, সেকুলারিজম বা প্রগতিশীলতার খোলসে। ধার্মিক জীবনে গুণ গুলোকে নৈতিকতা বলা হয় এবং শুধুমাত্র ধর্মই নৈতিকতার শিক্ষা দেয়৷ নৈতিকতা কেবলমাত্র ধর্ষণ থেকে দূরে রাখে না। চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, গুম, খুন সহ অনান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকেও দূরে রাখে৷ একথা মোটামুটি স্বীকৃত যে নৈতিকতার একমাত্র উৎস ধর্ম, কেউ কেউ আধা-জল খেয়ে আইন বা সমাজকে নৈতিকতার উৎস বলতে চায় কিন্তু সেটা অযৌক্তিক৷ তাহলে অধার্মিক জীবনে নৈতিকতার উৎস কি ? ধর্মের বিপরীতে যুক্তি দিয়ে কি ধর্ষণ প্রতিরোধ করা যাবে ?

একজন যুক্তিবাদী সেকুলারকে ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য যে সকল যুক্তি উপস্থাপন করা যেতে পারে- যেমন: ধর্ষণ একটি মন্দ কাজ, এটা অন্যের অধিকার নষ্ট করে, ধর্ষিতার সতিত্ব নষ্ট করে, সামজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে ইত্যাদি। একজন যুক্তিবাদী অধার্মিকের কাছে এসব যুক্তির প্রতিউত্তর আছে- ধর্ষণে যার সতীত্ব বা অধিকার নষ্ট হয় তার জন্য খারাপ হতে পারে, ধর্ষকের জন্য খারাপ নয়। বরং তার জন্য এটা ভালো, উপভোগ্য এবং আনন্দদায়ক। অর্থাৎ ধর্মের বিপরীতে অন্য কোন উপায়ে ধর্ষণ প্রতিকার কিছুটা সম্ভব হলেও প্রতিরোধে করা সম্ভব নয়৷ সুতরাং যদি ধর্ম ব্যতীত নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা বা ধর্ষণ থেকে দূরে রাখা সম্ভব না হয় এবং নৈতিকতার পরিবর্তে আইন প্রয়োগ করে ধর্ষণ মুক্ত সমাজ বিনির্মান অসম্ভব হয় তাহলে নৈতিকতার একমাত্র উৎস সেই ধর্মকে বাদ দিয়ে ধর্ষণ মুক্ত আধুনিক সভ্য সমাজ বিনির্মানে স্বপ্ন দেখা কতটা যৌক্তিক ?

আজ থেকে প্রতিটি সূর্যোদয় হোক নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপদ পথচলার ঘোষণা। আমাদের ধরণী হোক ধর্ষণ মুক্ত সভ্য সমাজ৷

লেখক: নুরুল আশফাক, ৩য় বর্ষ, সেশন: ২০১৭-১৮

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *