নক্ষত্রচূর্ণ যুগধর্ম: ঐতিহ্যের অনু্ভাব ও অনুচিন্তনের নিবিড় সংযোগ

[এটি  ইসলামের বিশুদ্ধ স্নিগ্ধতার  একটি নির্যাসধর্মী আলাপ  । বিস্তারিত হবার প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত করা  হয়েছে। পাঠক  তৃতীয় চোখের যোগসূত্র রাঙ্গিয়ে চিন্তালোকে  বেঘোর  সুখনিদ্রা উপভোগ করতে পারবেন।]

‘সাম্রাজ্যবাদ হল আইডেন্টিটির  রপ্তানি, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের শিকার দেশগুলোতে নিজেদের আইডেন্টিটি রপ্তানি করে তাদেরকে দাসানুদাস বানিয়ে শাসন ও শোষণ করার অভিপ্রায় ‘- এডওয়ার্ড সাঈদ।
 ইসলামকে পাশ্চাত্য অভিধান-অর্থে ধর্ম বানিয়ে ফেলা যায় না। দ্বীন ইসলাম ও ধর্ম একে অপরের পরিপূরক নয়,  সহাবস্থানও সম্ভব নয়।

ধর্ম হিসেবে ইসলাম অন্যদের মতো শুধু কেতাবি – একাডেমিক ভৌত দর্শন নয়, জীবনের সমাধান ;  অর্থনীতি,  সংস্কৃতি,  আচরণ, বিচারব্যবস্থার গাঁথুনির  একটা সার্বিক রেনেসাঁ। কল্যাণী ঐতিহ্যকে অবহেলা  ও উপকারী কালজ্ঞানকে   এড়িয়ে যেতে হয় না ইসলামে ।ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের স্বভাবধর্ম অনুসারে এটা স্বতঃসিদ্ধ যে ওয়াহী বা আসমানী আদেশের মৌলিক কায়দাকানুন  অনুধাবন করা ব্যতীত কোনো ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ধোপে  টিকে থাকতে পারে না। 


কুরআনের প্রেরণা থেকেই , ইবাদত হিসেবেই এক হাজার বছর ধরে প্রতিটি জামেয়ায় বিজ্ঞানের যুগান্তকারী অবদানগুলো সূচিত করেছেন মুসলিমরাই।

ইবনে রুশদের ব্যাপারটাই দেখুন। তিনি বলেছেন,  আল্লাহর মহিমা বুঝার জন্য এনাটমি  নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ উপায়।মুসলিম জাহানে ধর্মের দোহাই দিয়ে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পথে তোলা হয়নি দেয়াল।ইউরোপের প্রতিটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে যাচাই করা হতো বাইবেল ও তার ব্যাখ্যা দিয়ে। হৃদযন্ত্রের ডান প্রকোষ্ঠ থেকে শিরার মধ্যে দিয়ে বাম প্রকোষ্ঠে পুনরায় রক্ত ফিরে আসে বা পালমানারি সঞ্চালন নামে পরিচিত এনাটমির এ সূত্রটি দেন আরববিজ্ঞানী  ইবনুন নাফীস ।ল্যাতিন অনুবাদ পাঠে এ সম্পর্কে জেনে স্পেনের পাদ্রী মাইকেল সার্ভিটাস তা সমর্থন করলে পাদ্রীরা চটে গেলেন। তিনি অভিহিত হন   ঈশ্বরের শত্রু রূপে। আগুনে পোড়ানো হলো তাকে।মুসলিম জাহানে এ আবিষ্কারের প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো ইতিবাচক।

সুলতান বাইবার্সের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে মনোনীত হন ইবনুন নাফীস। মুসলিম জাহানের জ্ঞান‌মার্গের বাস্তবতা ছিল এমনই। দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া এলো দুই মহাদেশে। গির্জার বর্বরতার রোমহর্ষক বিবরণে  কম্পমান পাশ্চাত্যের খ্রিস্টবাদ। ধর্মের নামে পোপতন্ত্রের এই প্রগতি ও বিজ্ঞানবিরোধিতা প্রত্যাখ্যাত হয়ে এর চুল্লি থেকে অফুরন্ত জ্বালানি নেয়   সেকুলারিজম। খ্রিস্টধর্ম বিজ্ঞানকে ধর্ম দিয়ে শাসন করতে এবং রুখে দিতে চাইলো নতুন উদ্ভাবন ।ধর্ম বিজ্ঞানের শত্রু ও  বিজ্ঞান ইসলামের শত্রু , এরকম আপ্তবাক্যের মত অধুনা মুসলিম দুনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা,  সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি , শিল্প-সাহিত্য সহ সকল খাতে  গুরুতর তত্ত্বীয় মেরুকরণ চলমান। এর কারণ বস্তুবাদের দর্শন ও ইসলামের জগত দর্শন নিয়ে তুলনামূলক আলাপ বিকশিত হয়নি।

মূলত কোনো  শাস্ত্র ও গবেষণাধারা ইসলামকে ত্যক্ত করে না। প্রাকৃতিকবিজ্ঞান , সামাজিক‌বিজ্ঞান , রাষ্ট্রবিজ্ঞান,  নৃতত্ত্ব ,গণিত ইত্যাদিতে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর চিন্তাধারার সাথে ইসলামের স্ব স্ব বয়ানের মল্লযুদ্ধ করতে হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানকাণ্ড  হিসেবে এগুলো ইসলামী জ্ঞানমার্গের সহগামী।

জ্ঞান বলতে রাসূলুল্লাহ শুধু ঐশী জ্ঞানকেই বুঝতেন না। জ্ঞান ছিল তাঁর কাছে ব্যাপক। সে চীন দেশের জ্ঞানই হোক আর সুদূর ইউরোপের জ্ঞানই হোক, যে কোন উপায়ে লব্ধ জ্ঞানকে তিনি ইসলামের পক্ষে অবদানরূপেগ্রহণ করতেন। 
এনলাইটেনমেন্ট ও আধুনিকতার তাত্ত্বিক নকশায়  মৌলবাদকে পৈশাচিক  আকারে (Demonized creation ) হাজির করা হয়।  অথচ মৌলবাদ বা  ‘মূল আঁকড়ে থাকা’ ধর্মের আত্ম-সংরক্ষণের কবচ  ।  মোরাল ফিলোসফি বা নৈতিক দর্শনের পশ্চিমা প্রচেষ্টা গতিময় বাস্তব জীবনের কোন প্রগাঢ় দিশা  দিতে পারেনি,  ব্যক্তি মানুষের খাহেশাতের কুঠুরিতেই তা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সহস্র  বছরের চেষ্টার ফলে মুসলিম জাতিসত্তা  যতটুকু শুদ্ধ চিন্তা করে তা মিলে যায় ঐশী কিতাব বা ওয়াহীর প্রসঙ্গে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম শ্রেণী নিজেদের জন্য সেকুলারিজম,  জাতীয়তাবাদ , ব্যক্তিবাদ,  পশ্চিমা রাজনীতি ও সংস্কৃতির বাহক রূপে প্রকাশ হতে চান। ধর্মের যে সমস্ত শর্ত ও সূচকের বিপরীতে  সেকুলারিজমের সৃষ্টি তার কোনোটি ইসলাম ধর্মে পাওয়া যায় না।

সেক্যুলারিজম আমাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি। আমাদের জমিনে এ মতাদর্শ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু উপনিবেশের হাত ধরে আমরা এ মতবাদের ভোক্তা হয়ে গেছি। কুফর  (Infidelity) উদ্ভূত  জ্ঞানগত অপ্রশস্ততার (Cognitive narrowness) দরূণ   থাকায় ইসলাম বিদ্বেষের শিকার হতে হয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলের ওপর পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ‘সমান্তরাল বৈষম্য’ বা ‘হরাইজন্টাল ইন ইক্যুয়ালিটি’র শিকার হতে হয় মুসলিম জাহানকে। লিবিয়ায় ইতালীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে  ‘আসাদুস সাহারা’ বা মরুসিংহ খ্যাত মহান বীর উমর মুখতারের সানুসি প্রতিরোধ আন্দোলন  বিকশিত হয় । 

ভারতীয় উপমহাদেশে লর্ড ম্যাকলের কুখ্যাত ‘ম্যাকলে মিনিটস’ যেখানে তিনি শিক্ষানীতি প্রস্তাব করেন যার  মাধ্যমে ভারতীয়দের এমন বানানো হবে ‘ ‘যারা  রক্তে মাংসে হবে ভারতীয়, মাথা মগজ ও পোশাক-আশাকে হবে ইংরেজ।’ স্বাভাবিকভাবেই ধর্মচ্যুত এ নীতিতেই ভারতবর্ষের জাতীয় শিক্ষানীতি তথা মাদ্রাসা শিক্ষাকে ন্যাক্কারজনকভাবে  উপহাস করা হয়।  এ শিক্ষানীতি প্রায় একশ বছর চলে আসছিলো। জ্ঞানের উপনিবেশায়নের  প্রক্রিয়া  ও প্রকৃতি ‘শৈল্পিক দৃষ্টির’ আবরণে প্রাচ্যের লোকদের মগজের শক্তপোক্ত জায়গা করে নেয়। এই সময়ই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে উত্তরপ্রদেশের দেওবন্দ গ্রামে বপন করা হয় এক মহীরুহ   চিন্তাকেন্দ্র।  এ সময়টা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রেট বৃটেনে তখন চলছিল ভিক্টোরীয় যুগ। এই যুগের পুরো সময়টাতেই  ধর্মবিশ্বাস বিশেষত খ্রিস্টধর্মের সমালোচনায় মুখর ছিল চিন্তাজগত। খ্রিস্টধর্মীয় বিশ্বাস ব্যাপক ওলটপালট হয়েছে এ যুগে।

এই সময়কালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম  যেটাকে ‘সিপাহী বিদ্রোহ ‘  নাম দিয়ে খুব সহজেই দমন করা হয়েছে।

আর ভারতবর্ষ বৃটেনের রক্তচোষা ঔপনিবেশিক  করতলে  চলে আসে। তখন রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ দখলদারিত্বের পক্ষে ‘ জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’ বলে  সম্ভাষণ জানাচ্ছেন।উপমহাদেশে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নিপীড়িত সন্তানদের ব্রিটিশ বণিয়া বিরোধী সংগ্রামের ইতিহাস বিকশিত হয় ।  


কালের খেয়ায় মুসলমানরা  দাওয়াত তথা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংস্কারমূলক আন্দোলনে মনোনিবেশ করেন। বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায়  পশ্চিম আগ্রাসন রুখে দেওয়ার উদ্যোগ নেন আলেমরা। আর এ কর্মতৎপরতার দুর্গ হিসেবে ভূমিকা পালন করে মাদ্রাসা।


‘মাদ্রাসা শিক্ষা’ মুসলিম ভূখন্ডের ছড়িয়ে থাকা সমস্ত দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে দুনিয়ার সব মতবাদের যথোচিত মোকাবেলায় পর্যাপ্ত, সংশোধিত, স্বতঃস্ফূর্ত রসদের সমাহার ছিল।দশম-একাদশ শতকে মাদ্রাসা পড়ুয়া  মুসলিম মনীষীদের বইগুলো নিয়ে ইউরোপ চর্চা করেছে । সেসব চর্চা থেকে জন্ম নিয়েছে রেনেসাঁ,  উপনিবেশিত  পৃথিবী। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব এসব বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনকেও নেতিবাচক হিসেবে গণ্য করে।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের  পরে পশ্চিমা বিশ্ব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির স্বপ্ন দেখিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের উপনিবেশে পরিণত করে। এ ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন গুলো একটি নাইভ‌টি  বা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে।ইসলামপন্থীরা বুঝতে পারেনি,  জাতীয়তাবাদীরা কখনো ইসলামের কল্যাণকামী হতে পারে না। জাতীয়তাবাদীরাও মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে নেয়। একসময়ের ইখওয়ান-কর্মী জামাল আব্দুন নাসের ক্ষমতায় এসে সায়্যিদ কুতুব ,আব্দুল কাদির আওদাহ  সহ অসংখ্য ইখওয়ান নেতাকে  ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়। সিরিয়ায় হাফিজ আসাদ  ক্ষমতায় এসে একইভাবে নির্মমভাবে শহীদ করে দেয় হাজারো ইসলামী আন্দোলনের যোদ্ধাদের। এই উপমহাদেশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানে তারকা খচিত পতাকার প্রথম উত্তোলনকারী শাব্বির আহমদ উসমানীকে  বিষ প্রয়োগ করে শহীদ করে দেওয়া হয়। পরবর্তী কালে এসে ইসলামী আন্দোলনগুলো দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল নিয়মতান্ত্রিকভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে এবং তারা এস্টাবলিশমেন্টের হরিহর আত্মা হয়ে এস্টাবলিশমেন্টের মুণ্ডুপাত  করতে চায়।

আরেকদল এপলিটিকল থেকে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অবস্থা ‘সংসারে যারা সবকিছুকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে ,তাদের দুঃখ নেই।’ পৃথিবীর সর্বত্রই মুসলিমরা নিগ্রহ ও বৈষম্যের শিকার হলেও এর উত্তপ্ত উনুন মধ্যপ্রাচ্য।মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অধোগতির জ্বালামুখ শত  বছর পূর্বের  ‘সাইকস-পিকট ’ বানরের পিঠা ভাগাভাগির ব্যাধিতে ছয়শতবছর এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ  তিন মহাদেশ বিস্তৃত    বিশাল উসমানীয় খেলাফতের কবর রচিত হয়েছে। মুসলিম জাহান  শূন্য হয়ে পড়েছে বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে, বিশ্ব রাজনীতিতে মুসলিম স্বার্থ সংরক্ষণে সাহসী উচ্চারণ উধাও হয়ে গেছে।জায়নবাদী আগ্নেয়গিরির উদগীরণে উৎক্ষিপ্ত  ভস্ম ও ধোঁয়া ওঠেছে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্যে।  

কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের অন্তর্চ্ছেদে অবস্থিত   ককেশাসের  ইমাম শেখ শামিল থেকে শুরু করে  তুরস্কের আধুনিক ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা   প্রফেসর নাজমুদ্দীন এরবাকানের মতো সুমহান সংগ্রামী পুরুষগণের মুহুর্মুহু তোপধ্বনি শ্রুত হয় ।   ওসমানীয় খেলাফতের  সূচনাকারী ওসমান গাজীর পিতা  এরতুরুলের একসময়ের   রাজধানী কোনিয়া  থেকে ১৯৬৯সালে  যাত্রা করে   পাশ্চাত্যের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া  তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন মিল্লি গুরুশ।এ আন্দোলনের ফসল ইউরোপের বুকে একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বসনিয়ার স্বাধীনতা। তাই তো আয়া সোফিয়ার মতো  মুসলিম ঐতিহাসিক কিছু ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণকে তারা  বিশ্বদরবারে মুসলিম দুনিয়ার নতুন আঙ্গিকের ক্ষমতায়ন হিসেবে বিবেচনা করেন। পোড়ামাটির নীতির  বেলতলায় একবার নয় বারবারই যাওয়ার তিক্ততা কাটাতে চায় তারা।” ঘর পোড়া গরু সিঁদূরে মেঘ দেখলে ডরায়”–ইতিহাসের এ উদ্বাস্তু  পুনরাবৃত্তিতে শঙ্কিত হয়ে পড়ে ।

হিজাব -আরবী হরফ -আরবী আজান নিষিদ্ধকরণ, হাজ্জে গমনে নিষেধাজ্ঞা,  মসজিদ বিক্রি করে বার ও আস্তাবল বানানো , ইসলামী শিক্ষা নিষিদ্ধকরণের দৃশ্যপট তাদের হৃদয়ে  শূল হয়ে বিঁধে আছে ‌।৯/১১-এর  ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। একই সাথে আমেরিকা-রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতি প্রবেশ করে এক নতুন অধ্যায়ে। মধ্যযুগের ক্রুসেড যুদ্ধের পর পুনরায়  ইসলাম এবং পশ্চিমের  আদর্শ ও সভ্যতার সংঘাত সুস্পষ্ট আকারে প্রকট হয়।ইউরোপ আমেরিকার জমিন  এই হামলাকে কেবল একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের উপর হামলা হিসেবে নেয়নি, বরং পশ্চিমা সভ্যতার উপর হামলা হিসেবেই নিয়েছে।আফগানিস্তানে হামলা শুরু করার পর থেকে আমেরিকা ধর্ম ও রাষ্ট্রকে এক মনে করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়  ‘ব্যাড মুসলিম’ নামক এক কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় ।

১৯৯৩ সালে আমেরিকার প্রভাবশালী  রাজনীতি বিশেষজ্ঞ স্যামুয়েল হান্টিংটন তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘ সভ্যতার সংঘাত এবং বিশ্ব বিন্যাসের  পুনর্নির্মাণ ‘  (The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order) প্রকাশ করেন। তার মতে, সংঘাতন্মুখ এই দুই সভ্যতার একটি ইসলাম এবং অপরটি পশ্চিম। ইসলাম ও পশ্চিমের মাঝে যে পর্দাটি রয়েছে তা হলো সভ্যতা ও সংস্কৃতির। অতঃপর প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ বার্নার্ড লুইস তার প্রস্তাবনায় ‘গুড মুসলিম’ এবং ‘ব্যাড মুসলিম’ এর বিভাজন রেখা টানেন ।মুসলমানদের মাঝে যারা সেক্যুলার, লিবারেল ও গণতন্ত্রপন্থী, তারা পশ্চিমের পক্ষশক্তি। শত্রু হলো চরমপন্থী বা ব্যাড মুসলিমরা– যারা সেক্যুলারিজম, লিবারেলিজম, মানবাধিকার, ডেমোক্রেসিকে পশ্চিমা প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেখে এবং এর বিরোধিতা করে। সুতরাং মুসলিমরা নিজেরাই নিজেদের লড়াই করার কার্ড প্লে শুরু।

‘পশ্চিমা ইসলাম’ প্রস্তাবনার  সহজ অর্থ হলো, তাকে পশ্চিমা হতে বলা। উনবিংশ শতকের মিশর, মরক্কো ও ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শক্তি এমন একটি দলকে  তৈরী করতে সক্ষম হন  যারা আধুনিক হওয়ার নামে পশ্চিমা হওয়ার দিকে আহ্বান করেছিলেন। 

ইসলামি শরীআহ, রাজনীতি, জিহাদ, খেলাফাত , হিজাব, মাদ্রাসা, দাঁড়ি, টুপি কিংবা এ জাতীয় ইসলামের একান্ত মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে মানুষের মনে একধরনের ভীতি ও ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়েছে।ইসলামকে কট্টরপন্থা, মৌলবাদ, উগ্রবাদ এবং উদারবাদের মাঝে ভাগ করা হয়েছে। যে উদারতা অনিবার্যভাবেই শরীয়তের নির্ধারিত গণ্ডিকে অতিক্রম করে।

বিশেষত আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোতে  এমন অনেক আলেম উলামা রয়েছেন যারা  ইসলাম ও আধুনিকতাবাদের মাঝে যে আদর্শিক ও সভ্যতাগত পার্থক্য রয়েছে, সেটাকে জ্ঞানগত দিক থেকে সুকৌশলে মুছে ফেলার ইঁদুর দৌড়ে চলেন। ফলে এমন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হালআমলে  সমকাম, নারীবাদ, বিবর্তনবাদ, লিবারেলিজমের মতো ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক মতবাদ ও আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

বঙ্গীয় ব-দ্বীপের উন্নয়নশীল এদেশেও পশ্চিমা  ধূমায়িত চর্ব্য -চোষ্য-লেহ্য- পেয় তত্ত্ব থেকে নিবর্তনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক  খোরাক যোগান কিনে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমে অদলবদল , বিভিন্ন  ক্যাম্পাসে মাদ্রাসা ছাত্রদের সাথে করা বৈষম্য তথা সংজ্ঞায়ন,  ব্রান্ডিং ,ট্যাগিং, প্রান্তিকরণ  ,  মাদ্রাসা ও মাদ্রাসার ছাত্র বিরোধী এনজিও ও গোয়েবলোসীয় শিল্প প্রভাবিত কাঁচা মিথ্যার স্থূল প্রচার, রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পটির ‘সব ঝুট হ্যায়’ এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রকট প্রমাণ হিসেবে  ,  একই পরিপত্রে গড়ে ওঠা স্বতন্ত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করণ করা হলেও  স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষকের বেতন ১০০০ টাকা ,দেশে হাজার হাজার সরকারি স্কুল কলেজের ভিড়ে  সরকারি মাদরাসা  মাত্র ৩ টি,  ধর্মবাদী  প্রকল্পগুলোতে এমবেডেড জার্নালিজম বা  ‘গেঁথে যাওয়া সাংবাদিকতা’ বলে চিহ্নিত মিডিয়া কর্তৃক   উদ্ভট তথ্যের গলিত লাশের উৎকট গন্ধের উদগীরণ , পেশাদারিত্বকে  চাপিয়ে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়া  ইসলামী শক্তির মৃত, উম্মাহ চেতনা বিলুপ্তির রাজনীতি ইত্যাদি মুসলমানদের চেতনাবোধ বন্ধ করে দিয়েছে।


বিশাল বিশাল আছাড় , উথাল পাতাল, ঝড় ঝাপটার ভিতর দিয়ে উম্মাহর জীবনে উইজডম আসুক। চরম নাস্তিকতার যুগের অবসান পরবর্তী সংস্কারপন্থী  যুগের মধ্য দিয়ে নতুন যুগের তথা  ধর্মবোধের যুগ -ধর্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা,  আধ্যাত্মিকতা,  ধর্মীয় অনুভূতি ও পরিবেশ – সূচনা হবে।   ইসলামী যখন সমাধানের পথ দেখায় তখন বাদ মতবাদগুলো অন্ধকারে হারিয়ে যায়। বস্তুবাদী যান্ত্রিক আটপৌরে জীবনে হাঁপিয়ে উঠা এই আমাদেরকে জাহিলিয়াত  থেকে উচ্চতর জীবনের পথে চলার সীমাহীন শক্তি যোগাবে। মহামারিতে  বিপর্যস্ত ,মুখ থুবড়ে পড়া ধরণীতলের ন্যায় নক্ষত্রচূর্ণ এই উম্মতের জীবনে নেমে আসবে ‘নয়া স্বাভাবিক’। আইরিশ- আমেরিকান কবির বিরহ কবিতার মাধ্যমে পেশ করা হয় –

 

And when the danger passed,

and the people joined together again,

they grievedং their losses, 

and made new choices, 

and dreamed new images, 

and created new ways to live and heal the earth fully, 

as they had been healed.

লেখক: মাহমুদুল আহসান, ৩য়বর্ষ, সেশন: ২০১৭-১৮

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *