নবজাতক

ধর ধর ধর —-


দূর –
এটাও গেলোগা।

মন খারাপ হয়ে গেল ব্যাপারীর।
বড়শির টোপ পেলে বসে আছেন অনেকক্ষণ হল
কিন্তু এখন পর্যন্ত একটা পুঁটি মাছ ও ধরতে পারেননি।

মজুপুর গ্রামের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে
চলে গেছে এক বিশাল খাল ।
প্রতিবছর এই খালে ফোটে অজস্র শাপলা আর পদ্মফুল।
সে এক অপরূপ দৃশ্য।
পদ্মফুলের এই সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত না হওয়ার কোন উপায় নেই ।
নিজ জেলা তো বটেই অন্য জেলা থেকেও মানুষ দলবেঁধে আসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
কেউ আসে পদ্মদিঘি দেখতে
আবার কেউ আসেন মাছ ধরতে ।

বাড়িতে বিশাল পুকুর থাকলেও মাঝে মাঝে খালপাড়ে এসে মাছ ধরেন
ব্যাপারী ।
এতে নিরিবিলি তার হুক্কা টানার কাজটাও হয়ে যায়।
প্রতিদিন বোয়াল -টেংরা পোনাপুটির বেশ বড়সড় থলে নিয়ে বাড়িতে হাজির হলেও আজ মনে হচ্ছে তার কপালটা খারাপ ।
সকাল থেকে একটা পুটি মাছও
টোপ গেলেনি ।
সঙ্গীরা সবাই চলে গেলেও ;
তিনি বসে আছেন উদাসীন ভাবে।
খালি হাতে গৃহে প্রত্যাবর্তন করতে ইচ্ছে করছে না তার ।
কুটিরে বেগম সাহেবা কয়েক দিন থেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ।
সকালে হাঁটে গিয়েও মাছ পাননি।
তরতাজা মাছ অসুস্থ পত্মীর মুখে তুলে দিতে না পারলে –
তার কি পুরুষত্ব থাকে ?

বউয়ের মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠল ব্যাপারীর ;
গোলগাল কি সুন্দর মুখখানা ।
কত দুঃখ-সুখের মিতালি তার সাথে লেনা দেনা হয়ে গেছে।
সেই মুখখানা দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছে –
এর মধ্যে আবার মা হতে চলেছে।
আশেপাশে হাসপাতালও নেই যে চিকিত্সকের কাছে নিয়ে যাবেন।
তারপরেও সাধ্যের মধ্যে
সেবা-শুশ্রুষার কোন কমতি তিনি রাখেন নি।
পাশের বাড়ির খালাকে বাড়িতে এনে রেখেছেন প্রায় মাসখানেক হল –
কখন কি ঘটে যায় বলাতো যায় না।
এই কুটনি বুড়ির কাজ হল সারাদিন জর্দা দিয়ে পান খাওয়া
আর গলা উচিয়ে বলা

: হাবু চিন্তা লইচছা !
আল্লাই দিলে তোর হলা অইবো।
বুইজ্জত নি ?
মৌসিদে সিন্নি দেওয়ার মানত কর ।
বুইজ্জত নি ?

কথায় কথায় বুইজ্জতনি বলাটা তার স্বভাব।
মহিলাটা তাকে হাবু নামে ডাকার সাহস কোথায় পেল
সেটা আজো ব্যাপারীর বুঝে আসেনা।
ভাগ্যিস ঘরের মধ্যে ডাকে ;
না হয় পাড়াগাঁয়ের আট-দশটা মানুষের সামনে ডাকলে
তার মান সম্মান জলে মিশে যেতো ।
অনেকবার এই ব্যাপারে তাকে নিষেধ করতে গিয়েও তিনি কিছু বলতে পারেন নি – পাছে খালা মনে কষ্ট পাই
আর এতে তার অনাগত সন্তানের যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায়।
সন্তানের মঙ্গল কামনায় ইদানিং
দান করার মাত্রাটাও তিনি বৃদ্ধি করেছেন।
কাজের লোককে ধমকের সুরে বলে দিয়েছেন ।

“কুনো পকির যদি বাইততন হুদা আতে হিরে তই তোর চাকরি শেষ “।

উদাসীন মনে এসব কথায় ভাবছিলেন ব্যাপারী ।
হঠাত্ দেখলেন তমিজ তার দিকেই ছুটে আসছে।
ছেলেটাকে দেখে মেজাজ খারাপ হল ব্যাপারীর।
পত্মীর সাথে তমিজের গলায় গলায় ভাবটা এখনও আছে
বিষয়টা তিনি আজো মনস্তাত্ত্বিক ভাবে মেনে নিতে পারেননি।

: কাগা , কাগা –
তড়াতরি বাইত চলেন –
চাচী কেমন জানি করে ।

: কিয়া কস !!
বেবাক ঠিক আছেতো?

বড়শি ফেলে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়াতে থাকেন ব্যাপারী।
পথে পিচ্ছিল খেয়ে পড়ে যান কিন্তু উঠে দাঁড়ান আবারও ।
বুঝতে পারেন ;
শরীরে সেই লাঠিয়ালি শক্তি এখন আর নেই।
মনে মনে বেগমের হাসিমাখা মুখটি ভেসে উঠে তাঁর।
হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়িতে এসে শুনতে পান তিনি পুত্র সন্তানের জনক হয়েছেন।

কুটনি খালা বিরস বদনে
সন্তান কে তার হাতে তুলে দেন।
আলহামদুলিল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে আনন্দে খালাকে জড়িয়ে ধরেন ব্যাপারী।
উৎসাহী হয়ে তাকিয়ে থাকেন বাবুসোনার দিকে।
কি সুন্দর পিটপিট করা চোখজুড়ানো চেহারা তার ।
ঠিক যেন মাছের মত ।
বজ্রকন্ঠে আল্লাহু আকবর ধ্বনি শুনিয়ে দেন নবজাতকের অবচেতন মনে।
খুশির যেন কোন কমতি নেই আজ ।
ব্যাপারীর ইচ্ছে করছে
উঠোনে দাড়িয়ে তাকদুম তাকদুম নৃত্য পরিবেশন করতে।
বয়সটা আরেকটু কম হলে হয়তো করেই
ফেলতেন !!

ভাষা ভেদে শব্দ বদলায়,
স্থান ভেদে বদলায় উচ্চারণও।
তবে বদলায় না রক্তের টান।
মাতৃগর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বাবা কিংবা মা
যখন সন্তানের মুখ দেখে।
সেদিনের সেই সুখানুভুতিকে
কোন ভাষার সাহিত্যের মাপকাঠিতে প্রকাশ করা যায় না।
এই বিষয়টি আজীবন বাবা মায়ের হৃদয়েই অবশিষ্ট থেকে যায় ।
পৃথিবীর সব ভাষা এই অনুভূতির কাছে নতি স্বীকার করে ।

তড়িঘড়ি করে ব্যাপারী বাজারে যেতে চাইলেন ;
মিষ্টি কেনার তাগিদে।
খুশির গদগদে ভুলেই গেলেন পত্মীর কথা।

পিছন থেকে জামা টেনে ধরলো খালা

: কিয়া খালা ?
তোয়ার সম্মানি ?
কোন টেনশন লইয়োনা
পুরো দুই মন ধান দিমু।
তোয়ার একবছরের খোরাকি অইবো,
ওহন গঞ্জে যাইতে দাও ।

ডুকরে কেঁদে উঠলো খালা জড়িয়ে ধরলেন ভগ্নীপতি কে

: হাবুরে —-
শেফালী আর নাইরে —-

: কি কয়লা খালা !!

খালার চোখের জলে ভেসে গেল ব্যাপারীর সাদা গেঞ্জিটা ।

নিমেষেই বদলে গেল
ব্যাপারীর মুখাবয়ব।
তার মনে হল তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছেননা।
আকাশের নক্ষত্রগুলো তার উপর ভেঙ্গে পড়ছে একে একে।
আস্তে আস্তে মাটিতে বসে পড়েন ব্যাপারী।
বাকরুদ্ধ অবস্থায় সন্তানের পানে চেয়ে রইলেন দীর্ঘক্ষণ।
হঠাত্ সন্তানটাও কান্না শুরু করলো।
তারও হয়তো জানা হয়েগেছে।
এই জগতে
মা আর বেঁচে নেই !!
তাকে বড় হতে হবে ;
অযত্ন – অবহেলা আর অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে।

পরম করুণাময় আল্লাহর মনোবাসনা বুঝা বড়ই কঠিন ।
একদিক থেকে যেমন কিছু দেন আবার অন্যদিক থেকে কেড়েও নেন।

প্রতিটি মানুষের জীবনে বসন্তের মত কিছু মধুর সময় আসে ।
এই সময়টা স্মৃতির আঙ্গিনায় সর্বদা ভরপুর থাকে ।
যখন এই মধুর সময় নিয়ে জীবন চলতে থাকে ঠিক তখনি কালবৈশাখী ঝড়ের মত অনাকাঙিক্ষত আঘাত এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায় ।
কিছু আঘাত আছে যার ক্ষত কিছুদিনের মধ্যে শুকিয়ে যায়
কিন্তু এমন কিছু আঘাত আছে যেগুলো জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হয় ।
ইচ্ছে করলেও মুছে ফেলা যায় না।
কারণ জীবনটা ময়লাযুক্ত কাপড়ের মত
নয় ;
যে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে নির্মল করলেই তা আবার পরিষ্কার হয়ে যাবে ।
আর এটাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ।
শত চেষ্টা করেও অতীত স্মৃতি কে সে কখনো কবরস্থ করতে পারে না।

ব্যাপারী যেদিন শুনেছিল তার অনাগত সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় আছে
সেদিন থেকেই কত রঙিন স্বপ্নের জল্পনা একে বসে আছে সে ।

কাপড়ের দোকানে অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন তিনটা জামদানি শাড়ির জন্য ,

চল্লিশ সের মিষ্টির ওয়ার্ডার দিয়েছেন একেবারে ছানার টা ,

বাবুর্চির কাছে জানতে চেয়েছেন
কতজন মানুষের জন্য
সে এক বসায় রান্না করতে পারবে ??

এতিমখানাই নগদ টাকা পাঠিয়েছেন,

এত কিছু করার পরেও প্রত্যাশার পাল্লাটা ভারাক্রান্ত হলে দুঃখের আর অন্ত থাকেনা।
হঠাত্ তার মনে হল,
ভুলটাতো তাঁরই ;
তিনি সবার কাছে সন্তানের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
একবারের জন্যেও স্ত্রীর কথা মুখে আনেননি।
মা হওয়ার আগে একটা মেয়েকে যে কি পরিমান কষ্টের গ্লানি সহ্য করতে হয় তা বয়স্ক মা-জাতি ছাড়া অন্য কেউ অনুভব করতে পারেনা।
মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসে প্রত্যেক গর্ভবতী ।
বেশিরভাগ পুরুষদের এই বিষয়ে উদাসীন দৃষ্টিভঙ্গি থাকে ।
যারপরনাই স্ত্রীর উপর ভয়ঙ্কর ছোবল নেমে আসে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই।
মাঝেমাঝে এই ভয়ংকর ছোবল উভয়কেই মৃত্যুর দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে দেই।

একদিকে পিতা হবার আনন্দ
অন্যদিকে স্ত্রী হারানোর শোকাহত হৃদয় নিয়ে ভগ্নপ্রায়
শেফালি বেগমের কক্ষে গিয়ে দাঁড়ালো ব্যাপারী।
নিথর নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে তার অর্ধাঙ্গী – কি সুন্দর শ্যামল কোমল মুখখানা –
এইতো সেদিন
কত দুষ্ট মিষ্টি কথা শুনেছিলেন এই মুখে ,
বিনা অনুমতিতে কত আদর করেছিলেন ঐ ললাটে
আর আজ তাকে একা ফেলে ঐ ললাট চলে গেছে তার আসল উদ্দেশ্যে—–

খাটের কোনায় বসে গগনচুম্বী ডাকে কান্নায় ভেঙে পড়লো ব্যাপারী।
সারা বাড়ি জুড়ে নেমে আসলো শোকের ছায়া ।
আত্মীয় স্বজনেরা সকলেই জমায়েত হল বিদ্যুতের গতিতে।
শ্বশুরবাড়ির লোকজন চলে আসলো,
চারদিকে শুধু কান্নার আওয়াজ।
চোখের রোদনে ক্ষনে ক্ষনে কেপে উঠছে বাড়িটা।
এ যেন এক মৃত্যুপুরী !!
কোন এক দৈত্য এসে সবার মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে।
খাটের কোনাই অসাড় হয়ে পড়ে রইলো তার দেহটা।
কান্নাই চোখ দুটো ফুলে পদ্মফুল হয়ে গেছে ।
বাস্তবতা বড়ই রুদ্ধদ্বার !
শোকের মাতম নিয়ে ব্যাপারী পড়ে থাকলেও ;
সবাই তা পারলো না।
কেউ ব্যস্ত হয়ে গেল কবর খনন নিয়ে ,
আবার কেউ বা ব্যস্ত হয়ে গেল
গরম পানিতে তার কামলিওয়ালাকে জীবনের শেষ গোসল দিতে ।
আর ব্যাপারী বাকরুদ্ধ অবস্থায় বাবুসোনাকে কোলে নিয়ে পড়ে রইলেন খাটের কোনায়।
হঠাত্ ব্যাপারীর মায়ের স্মৃতি মনে পড়লো ।
ভীষণ ভাবে মনে পড়লো
কেমন ছিল তার জননী ?
জন্মের পর সেওতো মাকে হারিয়েছে ঠিক এইভাবে।


লেখক: যাযাবর
মাস্টার্স

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *