মুকুলের স্বপ্ন

মুকুলের স্বপ্ন

অনেকদিন পর বাড়ি এসেছে মুকুল। শীতের সন্ধ্যা। ফুল হাতা পাতলা একটা টিশার্ট পরে মাগরিবের নামাজ পড়তে মুকুল মসজিদে গেল। কিন্তু নামাজ পড়ে সোজা রাস্তা ধরে আসার পথে উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল হাওয়া তার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে কিছুটা উষ্ণতা পাওয়ার চেষ্টা করছে। মুকুল এখন মোহনপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়ে। মাদ্রাসাটি নামে ডাকে বেশ পরিচিত পুরো জেলায়। মুকুলের গ্রামের নাম কুমারখালী গ্রামে। এলাকাটা বেশ অজপাড়া। মানুষের পেশা বলতে কৃষিই উল্লেখযোগ্য। কুমারখালী বাজারে কিছু মানুষ ব্যবসা করে। একটিমাত্র প্রাইমারি স্কুল আছে গ্রামটিতে। একারণে শিক্ষার হার খুবই কম। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের দু’একজন দূরে শহরে গিয়ে পড়াশোনা করে। স্নাতোকোত্তর পড়ুয়া বড়জোর চার-পাঁচজন হবে। এলাকাবাসী অধিকাংশই নিরক্ষর। শিক্ষার গুরুত্ব তাদের কাছে খুব কম। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বদলে কৃষিকাজের দিকেই তাদের আগ্রহ বেশি। কুমারখালীর পাশাপাশি কামালপুর, আব্দুল্লাহপুর ও সখীপুর নামে আরো কয়েকটি গ্রাম আছে। কিন্তু এই বিশাল এলাকায় মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য শুধু একটি দাখিল মাদ্রাসা আছে। নাম আব্দুল্লাহপুর দাখিল মাদ্রাসা। মুকুল এখান থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে মোহনপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গিয়ে ভর্তি হয়। ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে মুকুল এলাকায় বেশ পরিচিত। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। ক্রিকেট ফুটবলেও তার সমান দক্ষতা। ক্লাস সিক্স থেকেই আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে তাকে হায়ার করে নিয়ে যেতো তাদের পক্ষে খেলার জন্য।

আব্দুল্লাহপুর গ্রামে অবস্থিত আব্দুল্লাহপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসারও বেশ সুনাম রয়েছে অত্র এলাকাগুলোতে। আশেপাশের গ্রামগুলোতে কোনো হাইস্কুল না থাকায় প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সবাই গিয়ে আব্দুল্লাহপুর মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। কিন্তু আরবি না জানার কারণে একটা বিশাল অংশ ঝরে পড়ে। হাই স্কুল দূরে হওয়াতে দু’একজন ভর্তি হলেও পরবর্তীতে পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খায়। মুকুল এখন ভাবতেছে কেন সোয়েটারটা হাতে করে নিয়ে এলোনা। আজ  বেশ অন্ধকার। মাঝে মাঝে রিকশার হারিকেনের আলো ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। গ্রাম হওয়াতে সন্ধ্যার সাথে সাথেই এলাকায় শুনশান নিরবতা নেমে এলো। দূরে দু’একটা শিয়ালের ডাক আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে। আকাশেও চাঁদ নেই। রাস্তার পাশের গাছগুলোকে ভুতুড়ে দেখাচ্ছে। হঠাৎ  হাতের ফোনটির ক্রিং ক্রিং শব্দে মুকুল সম্বিত ফিরে পেল। আবির ফোন দিয়েছে। আবির মোহনপুর হাইস্কুলে পড়ে।  দুজনে মিলে আজ বেশ কয়েকদিন ধরে একটা জিনিস নিয়ে ভাবছে। তাদের ভাবনার বিষয় হচ্ছে- তারা দুজন হয়ত প্রিভিলেজড পরিবারের ছেলে হওয়াতে মোহনপুরে এসে পড়াশোনা করতে পারতেছে। কিন্তু তাদের বা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কোনো না কোনো ভাবেই। এটার কয়েকটি কারণ আছে। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা, অভিভাবকের অসচেতনতা, দরিদ্রতা ইত্যাদি। শিক্ষা দীক্ষা না থাকার কারণে এলাকার যুব সমাজ নানারকম খারাপ কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। জুয়া, তাস, মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে। সমাজের মোড়লরা এসব দেখেও না দেখার ভান করতেছে। তারা দুজন মিলে ভাবছে কীভাবে সমাজে শিক্ষার হার বাড়ানো যায় এবং সমাজ থেকে এসব অসামাজিক কার্যকলাপ দূর করা যায়। কিন্তু এটা তারা একা পারবেনা। এটার জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা এলাকার শিক্ষিত সিনিয়র কয়েকজন ভাইয়ের সাথে কথা বললো। ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্থ হবে ভেবে দু’একজন অবশ্য বিরোধিতা করল ছাত্রজীবনে এগুলা না করার জন্য। কিন্তু মুকুল আর আবির তাদের কথা শুনলোনা। কথা বলার পর সবাই মিলে একটা সভা ডাকলো। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে একটি সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত আসলো যেটা শুধু শিক্ষা নিয়ে কাজ করবে। সমাজে কীভাবে শিক্ষার হার বাড়ানো যায়, কীভাবে ঝরে পড়া রোধ করা যায়, শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে কিভাবে সচেতনতা বাড়ানো যায়। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে কীভাবে অসামাজিক কার্যকলাপ রোধ করা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। বিভিন্ন সংগঠনের গঠনতন্ত্র পড়ে তারা একটি সংগঠন গড়ে তুলল। নাম রাখল কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরাম। তবে শুরুতেই বাধ সাধল শিক্ষিত দুজন। একজন বললো, “এসব আমাদের কাজ, তোমরা ছাত্র, তোমাদের এগুলো করার দরকার নাই।” তার কথার প্রতিউত্তরে মুকুল বললো, “ তাহলে আপনারা এতদিন করেন নাই কেন?” এসব নিয়ে বাকবিতন্ডা চললো।

সংগঠন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরপরই এলাকার মোড়লদের গাত্রদাহ শুরু হলো। তারা বলতে শুরু করল এদের মধ্যে নেতা হওয়ার খায়েশ জেগেছে। এরা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে তাদের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি হবে। মোড়লদের মধ্যে অন্যতম একজন তারা মিয়া, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের খুব কাছের লোক। একবার গ্রাম্য এক শালিসে চেয়ারম্যানকে ঘুষ খাইয়ে রায় নিজের পক্ষে নিয়ে আসে। তাছাড়া কুমারখালী গ্রামে চেয়ারম্যান অবৈধভাবে কয়েকজনের জমি হাতিয়ে নেওয়ার পর তারা মিয়াই এগুলোর দেখভাল করছে। তাই সবাই মিলে তাকে চেয়ারম্যানের কাছে পাঠালো। সে গিয়ে কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের নামে চেয়ারম্যানের কান ভারী করা শুরু করল। বললো, “এরা ক্লাব খুলছে, যা এলাকায় তাণ্ডব সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে। আপনি এদের রোধ করার ব্যবস্থা করুন।” চেয়ারম্যান তাকে জিজ্ঞেস করলো, “সংগঠনের উদ্যোক্তা কে?” “মুকুল”, তারা মিয়া উত্তর দিল। চেয়ারম্যান তার কাছ থেকে মুকুলের ফোন নম্বর নিয়ে মুকুলকে ফোন দিলো। বললো, “তোমরা শিক্ষিত মানুষ, এলাকায় সংগঠন-পংগঠনের নামে কী শুরু করে বেড়াচ্ছো! আমার ইউনিয়নে এসব চলবেনা একদম বলে দিলাম।” চেয়ারম্যান আকারে ইঙ্গিতে তাকে জেলের হুমকিও দিল। মুকুল দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে তার মাদ্রাসার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে গিয়ে খুলে বললো পুরো বিষয়টি । কুমারখালীকে ঘিরে তার স্বপ্নের কথাও বললো। উপজেলা চেয়ারম্যান সজ্জন লোক হিসেবে যথেষ্ট পরিচিত। শিক্ষানুরাগী মানুষ হিসেবে উদ্যোগটির কথা শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। বললেন, “তোমাদের মত ছেলেদের এদেশের খুবই দরকার। আমি অবশ্যই তোমাকে সহযোগিতা করবো। আমি তোমাদের এলাকায় যাবো।” মুকুল ভাবলো এইতো সুযোগ। সে উপজেলা চেয়ারম্যানকে প্রধান অতিথি করে কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভোধন করলো। অনুষ্ঠানে উপজেলা চেয়ারম্যান আসায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকেও আসতে হলো। ফলে সংগঠনটি উঠে দাঁড়াতে লাগলো। এটার ব্যানারে এলাকার গুটিকয়েক মাদ্রাসা কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী সমাজ থেকে তাস, জুয়া বন্ধে উদ্যোগ নিলো। ফলে মুকুল এবং কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরাম ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠল। যেসব যুবকদের সংসারের দিকে খেয়াল ছিলনা তাদের বাবা-মা সংগঠনটির জন্য মন খুলে দোয়া করতে থাকলো। সংগঠনের উদ্যোগে মুকুল এলাকার ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে পড়াতে শুরু করলো। কুমারখালী বাজার থেকে টাকা উঠিয়ে গরীব ছেলেমেয়েদের স্কুল মাদ্রাসার ইউনিফর্ম কিনে দিলো। ফলে দুই বছরের মধ্যেই ছেলেমেয়েদের স্কুল মাদ্রাসায় যাওয়ার হার বাড়তে থাকলো। এসব দেখে তারা মিয়াসহ অন্যন্য মোড়লদের তো মাথায় হাত। তারা মিয়া চিন্তা করলো এটার বিপরীতে আরেকটা সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। তাহলে এদের দমানো যাবে। সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে প্রধান উপদেষ্টা করে নিজে স্বঘোষিত সভাপতি হয়ে “কুমারখালী আদর্শ ক্লাব” গঠন করল।  এটা নামেই ক্লাব হয়ে থাকলো, কিন্তু কোনো উদ্দেশ্যও নাই, দৃশ্যমান কাজ কর্মও নাই।

ইতোমধ্যে মুকুল ও আবিরের দাখিল এবং এসসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো। মুকুল সাধারন বিভাগ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হলেও আবির সাইন্স থেকে ৪.৯৪ পেয়ে পাশ করলো। মুকুল একই মাদ্রাসায় আলিমে ভর্তি হলো। আবির ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হলো। তাদের দুজনের সামর্থ্য থাকার কারণে তারা এসএসসি পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডিতেও ঢুকে গেল। কিন্তু তাদের মত এলাকার আর অনেক শিক্ষার্থী মাধমিকও পেরুতে পারেনা। এ বিষয়টি মুকুলকে খুব ভাবিয়ে তুলল। সে সংগঠনের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে একটা হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কথা বললো। বললো, “কুমারখালী গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে একটা হাইস্কুলের অভাব অনুভব করছে। একটা হাইস্কুল খুবই দরকার”। সবাই মিলে উন্মুক্ত আলোচনা করলো। সিদ্ধান্ত নিল একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার।

ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। তিনি আপাতত ক্লাসরুমের জন্য তাঁর দোকানঘর ছেড়ে দিলেন। এলাকার বিশিষ্টজন, প্রবাসী, ধনী লোকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে অবকাঠামো নির্মান করলেন। কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের সদস্যরা অবসর সময়ে বিনা বেতনে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়াতে লাগলো। কিছুদিন পর এলাকায় স্কুলে যাওয়ার হার আগের তুলনায় বেড়ে গেল। একজন উপদেষ্টা তাঁর নিজের জমি দিলেন স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য। স্কুলটির শত সীমাবদ্ধতা থাকা স্বত্ত্বেও বেশ ভালোভাবেই চলতে থাকলো।

কুমারখালীর প্রধান সড়কটি এখনো কাঁচা। নির্বাচন আসলেই মেম্বার চেয়ারম্যানদের প্রধান ইশতেহার থাকে এবার রাস্তা পাকা হবেই। কিন্তু নির্বাচিত হয়ে গেলে তাদের আর কোনো খবর থাকেনা। বর্ষাকাল আসলেই রাস্তাটা কাদায় ভরে যায়।  চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের সদস্যরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে চাঁদা তুলে রাস্তাটা  সলিন করে দিলো।  এভাবে শিক্ষা ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সংগঠনটি ভূমিকা রাখতে শুরু করলো।

মুকুল একবার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসে স্কুলে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সাধারন জ্ঞানের কিছু বেসিক প্রশ্ন করলো। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা তাকে হতাশ করলো। দুএকজন ছাড়া কেউই উত্তর দিতে পারলোনা। সে দেখলো ছাত্রছাত্রীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো বইই পড়ছেনা। খেলাধুলাও তেমন করেনা। স্কুল মাদ্রাসার বাইরে সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। মোবাইল সহজলভ্য হওয়ায় অপসংস্কৃতির দ্রুত প্রসার ঘটছে। অথচ সে বাড়িতে থাকার সময় নিয়মিত খেলাধুলা চলতো। তাই সে সিদ্ধান্ত নিলো একটি পাঠাগার এবং একটি ক্রীড়া সংঘ প্রতিষ্ঠা করবে। পাঠাগারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগতের সাথে পরিচিত হবে। সেখানে বিখ্যাত লেখকদের বই থাকবে। ছাত্ররা অবসর সময়ের সেসব পড়ে জ্ঞান আহরণ করবে। ক্র্রীড়া সংঘের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা খেলাধুলার পাশাপাশি মনের খোরাকও জোগাবে। বাজে আড্ডা থেকে বিরত থাকবে। মুকুল কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করল বিষয় দুটি নিয়ে। তাঁরা ইতিবাচকিভাবে সাড়া দিলেন। সে বিভিন্নজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বই সংগ্রহ করে পাঠাগারে রাখল। নিজের টিউশনের টাকা, উপদেষ্টাদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে বই কিনে পাঠাগারে রাখল। এক-দেড় বছরের মাথায় কুমারখালীতে একটা বই পড়ুয়া কমিউনিটি তৈরি হয়ে গেলো। এবার তার ইচ্ছে একটি ডিবেটিং ক্লাব খুলবে। কুমারখালী স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও উপদেষ্টাদের সাথে পরামর্শ করে একটি ডিবেটিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করলো। মোহনপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসায় পড়ার সময় সে তুখোড় বিতার্কিক ছিলো। সেখানকার ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতির দায়িত্বও পালন করল এক বছর। সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিতর্ক কিভাবে করতে হয় তা ছাত্রছাত্রীদের শিখিয়ে দিল। ফলে কুমারখালীর ছেলে মেয়েরা এখন যুক্তিতে মুক্তি খোঁজে। কিছুদিন পর স্টুডেন্ট ফোরাম একটি ম্যাগাজিন বের করলো। প্রাইমারি , হাইস্কুল ও আব্দুল্লাহপুর মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের কচি হাতের লেখায় ম্যাগাজিনটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। তাদের লেখক স্বত্ত্বার স্ফূরণ ঘটতে থাকলো। ইতোমধ্যে কুমারখালী গ্রাম শতভাগ বিদ্যুতায়িত হলো। রাস্তাও পাকা হয়ে গেলো। সব জায়গায় উন্নয়নের ছোঁয়া। মুকুলের স্বপ্নের কুমারখালী গ্রামের শিক্ষার হার এখন শতভাগ।

আলিম পরীক্ষা দেওয়ার পর মুকুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলেও কোনো পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চান্স হয়নি। মোহনপুর সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে অনার্সে ভর্তি হলো সে। এখন সে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। পূজোর ছুটিতে সে বাড়িতে এলো। পরদিন দেখে তাদের ঘরের সামনে তারই পরিচিত কিছু ছেলে নেশা করছে। এটা দেখে সে যারপরনাই অবাক হলো। সে তাদের বাধা দিলো। বললো যাতে অন্তত তাদের ঘরের সামনে নেশা না করে। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে এক ছেলে তাকে ছুরি দিয়ে পেটের মাঝ বরাবর আঘাত করে। এতে তার পেটের নাড়িভুড়ি বের হয়ে যায়। তার চিৎকারে আশে পাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেলে বখাটেরা পালিয়ে যায়। মুকুলকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে সিএঞ্জিতেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মারা যাওয়ার আগ মুহূর্তেও তার মুখে কুমারখালীর নাম উচ্চারিত হয়, তার স্বপ্নের কুমারখালী।


লেখক: আনসার উদ্দিন মনির, ৩য় বর্ষ

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *