লক্ষ্মীপুর: যে কারনে বলা হয় ‘সুপারির রাজধানী ‘ ও ‘সয়াল্যান্ড’

লক্ষ্মীপুর বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের আওতাধীন একটি জেলা ৷ জেলার পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশ মেঘনা নদীর বিস্তৃত জলরাশি দ্বারা বেষ্টিত। জেলার পূর্বে নোয়াখালী জেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী ও ভোলা জেলা, উত্তরে চাঁদপুর এবং পশ্চিমে ভোলা ও বরিশাল জেলা অবস্থিত ।
লক্ষ্মী শব্দের অর্থ ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী আর পুর শব্দের অর্থ হলো শহর বা নগর। সুতরাং লক্ষ্মীপুর অর্থ হলো সম্পদ সমৃদ্ধ শহর বা সৌভাগ্যের নগরী ।

লক্ষ্মীপুর যে প্রকৃতই একটি সৌভাগ্যের নগরী তা প্রতিবছর এই জেলার কৃষিপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতায় বোঝা যায় ।
লক্ষ্মীপুর জেলার নামকরণ নিয়ে কয়েকটা মত প্রচলিত রয়েছে ৷ তবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত মতটি ‘রাজপুরুষ যোগীবংশ’ নামক একটি গবেষণামূলক গ্রন্থে পাওয়া যায় । শ্রীসুরেশ

চন্দ্রনাথ মজুমদার এই গ্রন্থে লিখেছেন যে, রাজা গৌরকিশোর রায়চৌধুরী নামে দালাল বাজারে একজন জমিদার ছিলেন যিনি ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে রাজা উপাধি লাভ করেন । রাজা গৌরকিশোরের বংশের প্রথম পুরুষ লক্ষ্মীনারায়ণ রায় (বৈষ্ণব) এবং রাজা গৌরকিশোরের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া । অনেকে মনে করেন, লক্ষ্মীনারায়ন রায় অথবা লক্ষ্মীপ্রিয়া এই দুজনের কারো নাম অনুসারে লক্ষ্মীপুরের নামকরণ করা হয় । তবে লক্ষ্মীপুর নামকরণ দালাল বাজারের জমিদার কর্তৃক হয়েছিল একথা অধিক স্বীকৃত ।

১৯৮৪ সালের২৮ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ ও রামগতি এই চারটি উপজেলা নিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা গঠিত হয় । উপকূলীয় অঞ্চল ও কৃষি ফসল উৎপাদনে অনুকূল আবহাওয়ার কারনে জেলায় প্রচুর পরিমানে কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয় ৷

এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদিত কৃষিপণ্য হলো সুপারি, সয়াবিন, নারিকেল, পান ইত্যাদি । এর মধ্যে বাংলাদেশে সুপারি ও সয়াবিন উৎপাদনে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রথম । প্রতিবছর দেশে মোট উৎপাদিত সুপারির প্রায় অর্ধেক এবং মোট উৎপাদিত সয়াবিনের প্রায় ৭০ ভাগ এই জেলায় উৎপাদিত হয় ।

সুপারি উৎপাদনে শীর্ষে
উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর দেশে সুপারির ‘রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত । প্রতিবছর দেশের মোট সুপারির অর্ধেকের বেশি সুপারির যোগান হয় এই অঞ্চল থেকে ।
প্রতিবছর সাধারণত বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাসে সুপারি গাছে ফুল হয়। পরবর্তীতে কার্তিক ও অগ্রহায়ন এই মাসে ফুলগুলো সুপারিতে পরিণত এবং পুরোপুরি পেকে যায়। কার্তিক মাসের শেষ এবং পুরো অগ্রহায়ন মাস সুপারির ভরা মৌসুম হিসেবে পরিচিত । মৌসুমের শুরু থেকে জেলা জুড়ে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন হাটবাজারে সুপারি কেনাবেচায় ব্যস্ত দেখা যায় ।
উপকূলীয় এই অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য বেশ অনুকূল হওয়ায় সুপারি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এছাড়া দেশে সুপারির দাম ও চাহিদা ভালো থাকায় কৃষকদের মধ্যে সুপারি চাষের আগ্রহ বাড়ছে । আর সুপারি উৎপাদনে অন্যান্য কৃষি দ্রব্য উৎপাদনের মতো ঝুঁকি নেই । ফলে সুপারি চাষ করলে লাভ হবে এমন একটা প্রবণতা থেকেই কৃষকদের মধ্যে সুপারির চাষ বেড়ে চলেছে ।

সুপারি চাষের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে কৃষকদের খুব বেশি পরিচর্যা করতে হয় না । সুপারি গাছ একবার রোপন করলে অনায়াসে টানা ৩৫-৪০ বছর ভালো ফলন হয় । সুপারির বাগানে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই হওয়ার সম্ভাবনা ও পোকামাকড়ের আক্রমনের সম্ভাবনা অন্যান্য কৃষি দ্রব্যের তুলনায় কম ।

অন্যদিকে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সুপারি উৎপাদনে বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে করে আগের তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এভাবে সুপারি উৎপাদনে শ্রম, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় কৃষকরা সহজে এটি উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন ।
বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলাজুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে সুপারির চাষ করা হচ্ছে । এতে দেশের সিংহভাগ ভাগ সুপারি উৎপাদিত হচ্ছে যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে । জেলায় সবচেয়ে বেশী সুপারি উৎপাদন হয় সদর, রামগতি, রায়পুর উপজেলায় । সারি সারি সুপারির বাগান স্থানীয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করে ।

পরিসংখ্যান বলছে, সুপারি এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ফসল । হিসাব অনুযায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সারাদেশে মোট দুই লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৩ টন সুপারি উৎপাদিত হয়েছে । এর মধ্যে এককভাবে শুধু লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট এক লাখ ৩১ হাজার ৫৯৩ টন সুপারির উৎপাদন হয়েছে ৷ যার বাজার মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা ।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুর জেলার ৫টি উপজেলায় মোট ছয় হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত সুপারির বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা । ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুরে ছয় হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদিত সুপারির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল সাড়ে ১২ হাজার মেট্রিক টন । যার বাজার মূল্য ছিল ৩৫০ কোটি টাকা ।
প্রতিবছর মৌসুমের শুরু থেকেই লক্ষ্মীপুর জেলার নানা জায়গায় সুপারির হাট জমজমাট হয়ে উঠে । সদর উপজেলার মান্দারী, জকসিন, দত্তপাড়া, ভবানীগঞ্জ, চররুহিতা, পৌর বাজার, দালাল বাজার সহ বিভিন্ন জায়গায় সুপারির বাজার বসে৷ রায়পুর উপজেলার সোনাপুর, খাসের হাট, পৌর বাজার, দেনায়েতপুর, মোল্লারহাট, হায়দরগঞ্জে সুপারি ক্রয় বিক্রয়ের হাট বসে । রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুর বাজার, করপাড়া বাজারে হাট বসে । এসব নির্দিষ্ট স্থান ছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে সুপারির ছোট বড় বাজার বসে থাকে ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলে উৎপাদিত মোট সুপারির প্রায় ৭০ ভাগ নদী-নালা, ডোবা, পুকুর, পানিভর্তি কোনো ঘরে ভিজিয়ে রাখেন ৷ অন্যদিকে মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ ভাগ সুপারি সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয় ।

লক্ষ্মীপুর যখন ‘সয়াল্যান্ড’
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে অন্যতম সম্ভাবনাময়ী ফসল হলো সয়াবিন ৷ বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায় সয়াবিনের চাষ করা হয় । এদিকে শুধুমাত্র এককভাবে লক্ষ্মীপুর জেলায় দেশের মোট সয়াবিনের প্রায় ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয়।
বেলে ও দোঁআশ মাটি এবং আবহাওয়া এই অঞ্চলে সয়াবিন উৎপাদনে বেশ উপযোগী । এছাড়া সয়াবিন উৎপাদনে খরচ তুলনামূলক কম, ফলন বেশি এবং বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায় বলে এই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে সয়াবিন উৎপাদনের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে ৷
জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রথম সয়াবিনের চাষ শুরু হয় ১৯৮২ সালে । জেলার রামগতি উপজেলায় ১ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সয়াবিনের চাষ করা হয় । প্রাথমিকভাবে সয়াবিন চাষ করে তেমন সাফল্য পাওয়া যায়নি । পরবর্তীতে ১০ বছর পর ১৯৯২ সালে মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি (এমসিসি) ও ডর্প নামে দুটি বেসরকারি সংস্থা সয়াবিন চাষে আগ্রহ দেখায় । এই দুটি উন্নয়ন সংস্থা কৃষকদেরকে নানাভাবে সয়াবিন চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে । তারপর ধীরে ধীরে জেলাব্যাপী কৃষকদের হাতে সয়াবিনের চাষ বৃদ্ধি পায় ।

স্বল্প খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণে ভালো লাভবান হওয়া যায় বিধায় জেলার সদর, রামগতি, রায়পুর ও কমলনগরে কৃষকরা ব্যাপকভাবে সয়াবিন চাষ করে থাকে । জেলাব্যাপী প্রায় ৭৫ হাজার কৃষক সযাবিন চাষের সাথে জড়িত ।
পরিসংখ্যান বলছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত সয়াবিনের প্রায় ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয়েছে শুধু লক্ষ্মীপুর জেলায় । সয়াবিন উৎপাদনে লক্ষ্মীপুর জেলার এই ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে জেলাটি ‘ সয়াল্যান্ড ‘ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে । ২০১৭ সালে সয়াবিন উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারনে লক্ষ্মীপুর জেলাকে ‘ সয়াল্যান্ড’ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে ৷
লক্ষ্মীপুর জেলায় বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত সয়াবিন জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ৷ তথ্য বলছে, ২০০৯ -১০ অর্থবছরে লক্ষ্মীপুর জেলায় ৩৫ হাজার ৬শ ২২ হেক্টর জমিতে মোট ৬৬ হাজার ৬শ ১০ মেট্রিক টন সয়াবিন উৎপাদিত হয় ৷ ২০১০-১১ অর্থবছরে জেলায় মোট ৩৯ হাজার ২শ ৮৭ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করে ৭০ হাজার ৫শ ২০ মেট্রিক টন সয়াবিন উৎপাদন করা হয় ।
২০১৫-১৬ তে লক্ষ্মীপুরের ৫২,৭২০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ লক্ষ মেট্রিক টন সয়াবিন উৎপন্ন হয় । যার বাজার মূল্য ধরা হয়েছিল ৩শ কোটি টাকার বেশি । ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ৮০ হাজার ৪২২ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৯ টন সয়াবিন উৎপাদিত হয় । একই বছর শুধু লক্ষ্মীপুর জেলায় ৮৬ হাজার ৪১০ টন সয়াবিন উৎপন্ন হয় যা সারাদেশে মোট উৎপাদনের শতকরা ৫৯.৮০ ভাগ । ২০১৯ সালে সয়াবিন থেকে লক্ষ্মীপুর আয় করেছে ৩২৪ কোটি টাকা ।
এছাড়া ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর জেলায় সারাদেশে উৎপাদিত মোট সয়াবিনের ৬৫ ভাগ উৎপন্ন হয়েছে ।

২০১৬ সালে মোট সয়াবিনের ৫০ ভাগ এবং ২০১৭ সালে সারাদেশে মোট সয়াবিনের ৬০ ভাগ লক্ষ্মীপুর জেলায় উৎপন্ন হয়েছে ৷
সাধারণত রবি মৌসুমে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সয়াবিন বপন করা হয় । বপন করার ৯০ থেকে ১১০ দিন পর মে মাস থেকে আগষ্ট মাস পর্যন্ত ফসল সংগ্রহ করা হয় । সয়াবিন চাষ অন্যান্য রবি ফসলের চেয়ে বেশি লাভজনক । প্রতি হেক্টর সয়াবিন উৎপাদনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা খরচ হয় । ফলন ভালো হলে এবং বাজারে সয়াবিনের আশানুরূপ দাম পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচের কয়েকগুন বেশি লাভ করার সম্ভাবনা থাকে । যা অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করে আশা করা যায় না । ফলে জেলার কৃষকরা সয়াবিন উৎপাদনের প্রতি ঝুঁকছে ।
এই অঞ্চলের অপ্রতুল সেচ ব্যবস্থা লক্ষ্মীপুর জেলায় সয়াবিন চাষের ব্যাপক প্রচলনের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ৷ কেননা সয়াবিন চাষের জন্য সেচের খুব একটা প্রয়োজন হয় না । ফলে সয়াবিন চাষ করার শুরুর দিকে বৃষ্টিপাত হলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না । তবে বৃষ্টিপাত শেষ দিকে হলে ফসলের বড় আকারে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ।

সয়াবিন উৎপাদন সামগ্রিকভাবে লাভজনক । পরিবেশবান্ধব এই ফসল উৎপাদনে খুব স্বল্প পরিমাণ সারের প্রয়োজন হয় এবং সেচেরও তেমন প্রয়োজন হয় না । শিম গোত্রের ফসল হওয়ার কারনে সয়াবিনের শিকড়ে নডিউল তৈরি হয় । নডিউল থেকে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২৫০ কেজি নাইট্রোজেন (ইউরিয়া সার) সংবন্ধন হয় । সয়াবিন গাছের বৃদ্ধিতে এই নাইট্রোজেন সার সাহায্য করে এবং মাটিতে যুক্ত হয়ে সারের একটি অংশ পরবর্তীতে ফসল উৎপাদনে অবদান রাখে ।সয়াবিন চাষ করতে কৃষকদের ৩-৪ মাস সময় লাগে । একেকটা সয়াবিন গাছের উচ্চতা বয়সভেদে ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়৷
এদিকে লক্ষ্মীপুর জেলায় আগে বিভিন্ন চরাঞ্চলে তরমুজ, মরিচ, খেসারি, মুগ ডাল সহ বিভিন্ন রবিশস্য চাষ করা হতো । কিন্তু বর্তমানে এসব রবিশস্যের চাষ তেমন দেখা যায় না । এসবের পরিবর্তে বর্তমানে জেলাজুড়ে কৃষকরা চাষযোগ্য জমিতে সয়াবিন উৎপাদনে আগ্রহ দেখাচ্ছে ।
এখানে উৎপাদিত সয়াবিন মূলত তিনটি ব্যক্তি মালিকানাধীন অটো সয়াবিন মিলে প্রক্রিয়াজাত করা হয়ে থাকে ।

কোয়ালিটি এগ্রো ও চৌধুরী অটো সয়াবিন প্রক্রিয়া কেন্দ্র নামক দুটি কারখানা রয়েছে সদর উপজেলার বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় আর তৃতীয় কারখানাটি হলো বিইউসি এগ্রো লিমিটেড যা সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় অবস্থিত ।


লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ, কমলনগর উপজেলার একাধিক স্থান, রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ বাজার , খাসেরহাট, মোলার হাট, হাজীমারা ও আখন বাজার সহ বিভিন্ন জায়গায় সয়াবিন ক্রয় বিক্রয় করা হয় ৷

শুধু হায়দরগঞ্জ বাজারে সয়াবিনকে কেন্দ্র ৫টি চাতাল ও প্রায় ৭০টি পাইকারি দোকান গড়ে উঠেছে । প্রতিবছর দেশের মোট সয়াবিনের একটা বিশাল অংশ এসব জায়গায় বেচাকেনা হয় ।
মাঠ থেকে সয়াবিন আহরণ করার পর অটোমেটিক মেশিনের মাধ্যমে সিদ্ধ করে শুকানো হয় । পরবর্তীতে শুকনো সয়াবিন বিভিন্ন শিল্প যেমন পোলট্রি, তেলবীজ, ডালবীজ ইত্যাদির কাঁচামাল হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করে সরবরাহ করা হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সয়াবিন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে । জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব পড়ছে ৷ জলবায়ুর সংকটের কারণে ২০১৪ সাল থেকে সয়াবিন উৎপাদনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে । ফলে সয়াবিন উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে ৷


কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ৩ বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সয়াবিন নষ্ট হয়েছে । এছাড়া চলতি বছরও সয়াবিন উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি । প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে সয়াবিন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে । প্রতিবছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে দেশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় ৷ এতে করে সয়াবিনে পচন ধরে যার ফলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৷
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর জেলা সুপারির রাজধানী হিসেবে পরিচিত হলেও পুরো জেলায় সুপারির কোনো প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র নেই । প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র না থাকার কারনে অনেক সময় সুপারির ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন কৃষকরা ।

প্রতি বছর লক্ষ্মীপুরে উৎপাদিত সুপারির গড় বাজার মূল্য প্রায় ৩৩০কোটি টাকা এবং সয়াবিনের ক্ষেত্রে বাজার মূল্য থাকে ৩০০ কোটি টাকা ।প্রযুক্তির যথাযোগ্য ব্যবহার আর সরকারি সহায়তা সময়মতো পেলে সুপারি ও সয়াবিনের প্রতিটি থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা আয় করতে পারবেল ক্ষ্মীপুর যা গ্রামীন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে ।

৬৪টি জেলার সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ একটি অনন্য সুন্দর দেশ । অন্তত এটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাই বলে । একদা কবি এদেশটিকে ‘সকল দেশের রানী ‘ বলে সম্বোধন করেছেন । বাংলাদেশের একেকটি জেলা এককেকটি নামে বিখ্যাত । যেমন :- চট্টগ্রাম পরিচিত ‘বন্দর নগরী’, ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ নামে, চাঁদপুর ইলিশের জন্য বিখ্যাত, ঢাকা দেশের রাজধানী, পর্যটনের জন্য বিখ্যাত কক্সবাজার ইত্যাদি ।
তেমনি লক্ষ্মীপুর জেলার কিছু খ্যাতি রয়েছে । এই জেলার খ্যাতিটা মূলত কৃষিপণ্য উৎপাদনের একক আধিপত্যের কারনে ৷ সুপারি, সয়াবিন, নারিকেল সহ কিছু কৃষিদ্রব্যের সিংহভাগ উৎপাদন হয় এই জেলায় । প্রতিবছর দেশে মোট উৎপাদিত সুপারির প্রায় অর্ধেক এবং মোট উৎপাদিত সয়াবিনের প্রায় ৭০ ভাগ এই জেলায় উৎপন্ন হয় ৷ তাই লক্ষ্মীপুর জেলাকে বলা হয় ‘সুপারির রাজধানী’, ‘সয়াল্যান্ড ‘ কিংবা ‘সয়াবিনের লক্ষ্মীপুর ‘।

লেখক: মোছাদ্দেক বিল্লাহ, ৩য় বর্ষ, সেশন: ২০১৭-১৮

Spread the love

Post Author:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *